আপনার সম্পর্কে সাতটি সত্য

আপনি যতদিন বেঁচে আছেন ততদিন সুখী, প্রশান্ত, আনন্দময় এবং উত্তেজনায় পরিপূর্ণ এক জীবন যাপনের অধিকার আপনার আছে। আপনার সৃষ্টিই এজন্য। এই স্বাভাবিক অবস্থায় আপনি প্রতি সকালে ঘুম থেকে উঠবেন একটি সুন্দর দিন শুরু করার জন্য। আপনি আপনার নিজের সম্পর্কে এবং অন্যদের সঙ্গে সম্পর্কগুলোকে চমৎকার মনে করবেন। আপনি আপনার কাজকে উপভোগ করবেন এবং কোনো পরিবর্তন আনায় অবদান রাখতে পেরে নিজেকে গর্বিত মনে করবেন। আপনার প্রধান লক্ষ্য হবে আপনার জীবনকে এমনভাবে গুছিয়ে নেয়া যাতে প্রতিদিন আপনি এসব অনুভব করতে পারেন।

পরিপূর্ণ ও পূর্ণবয়স্ক মানুষ হিসেবে আপনি প্রতিদিন এমনকিছু করবেন যা আপনাকে আপনার সম্ভাবনার পরিপূর্ণতার দিকে নিয়ে যাবে। আপনার চারপাশে বিভিন্ন অনুগ্রহের জন্য আপনি কৃতজ্ঞ হবেন। আপনি যদি জীবনের কোনো অংশে কিছু নিয়ে অসুখী কিংবা অসন্তুষ্ট হন, তাহলে আপনার চিন্তা, অনুভূতি কিংবা কাজে কোনোভাবে গলদ আছে বলতেই হবে; এটি দ্রুত সংশোধন করতে হবে।

আপনার পুরো সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর আগে আপনাকে অনুভব করতে হবে আপনি ভেতরে ভেতরে আসলে এক রাজপুত্র কিংবা রাজকন্যা-ই।

আপনি আজ কোথায় সেটা বড় বিষয় নয়, কিংবা অতীতে কী করেছেন আর কী করেননি সেটিও ব্যাপার নয়, ব্যক্তি হিসেবে আপনাকে নিচের সাতটি সত্য বিশ্বাস করতে হবে:

১. আপনি সম্পূর্ণভাবে একজন ভাল ও চমৎকার মানুষ; আপনি মূল্যবান এবং কাজের। আপনার চেয়ে ভাল কেউ নেই, কেউ আপনার চেয়ে বেশি অনুগ্রহপ্রাপ্তও নয়।

আপনি যদি নিজের ভালত্ব ও গুরুত্ব সম্পর্কে সন্দেহ করেন তাহলে নিজেই নিজেকে প্রশ্নের মধ্যে ফেলে দেন। আপনি ভাল মানুষ এটিতে সন্দেহের উদ্রেক হওয়ামাত্রই আপনার মধ্যে অসন্তুষ্টির জন্ম নেয়।

২. আপনি গুরুত্বপূর্ণ, অনেক দিক দিয়েই। প্রথমেই বলতে হয়, আপনি গুরুত্বপূর্ণ নিজের কাছেই। ব্যক্তি হিসেবে আপনার নিজের জগৎ আপনাকে ঘিরেই। আপনি যা দেখেন, যা শোনেন তাতে অর্থ দেন নিজের মতো করে। আপনার এই জগতের কোনো কিছুরই গুরুত্ব নেই যদি না আপনি সেসবকে গুরুত্ব দেন। আপনি যদি কবিতা লেখেন, সেটিকে তাচ্ছিল্য করতে পারবে সবাই – কেবল আপনি যদি তাচ্ছিল্য না করেন, সেটি করতে ভালবাসেন তাহলে কারো সাধ্য নেই আপনাকে কবিতা লেখা থেকে বিরত রাখে।

আপনি আপনার পিতা-মাতার নিকটও গুরুত্বপূর্ণ। আপনার জন্ম তাঁদের জীবনের এক তাৎপর্যময় মুহূর্ত; এরপর আপনি যখন বেড়ে উঠেছেন তখন আপনি যা কিছু করেছেন তার সবকিছুই তাঁদের নিকট মহাগুরুত্বপূর্ণ, তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আপনি গুরুত্বপূর্ণ আপনার পরিবারের নিকট; আপনার সঙ্গী, আপনার স্ত্রী/স্বামীর নিকট; আপনার কন্যা কিংবা পুত্রের নিকট, পরিবারের অন্যান্যদের নিকট, এমনকি আপনার আশেপাশের অনেকের নিকটই আপনি গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যা করেন কিংবা বলেন তার অনেক প্রভাব তাদের উপর।

আপনি গুরুত্বপূর্ণ আপনার কোম্পানি, কাস্টমার, সহকর্মী ও কম্যুনিটির নিকট। আপনি যা করেন কিংবা করেন না তার গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়তে পারে তাদের জীবনে, তাদের কাজে।

আপনি নিজেকে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভাবছেন তার উপরই অনেকটা নির্ভর করছে আপনার জীবনের মান। সুখী ও সফল মানুষরা নিজেদেরকে গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান অনুভব করে। যেহেতু তারা নিজেদেরকে এভাবে অনুভব করে এবং সেভাবে কাজ করে তাই এটি তাদের জন্য সত্য হয়।

অসুখী ও হতাশ মানুষ নিজেকে তুচ্ছ ও অমূল্যবান মনে করে। তারা অসহিষ্ঞু হয়ে ওঠে ও নিজেদের অপদার্থ মনে করে। তারা অনুভব করে, ‘আমি যথেষ্ট ভাল নই’, ‘আমি কোনো কাজের নই’; আর এই অনুভূতির কারণে তারা জগৎকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আত্মবিধ্বংসী আচরণে লিপ্ত হয় যা তার নিজের ও অন্যদের ক্ষতি করে।

তারা উপলব্ধি করতে পারে না যে তারা ভেতরে ভেতরে একটা রাজপুত্র কিংবা রাজকন্যা।

৩. আপনার রয়েছে অসীম সম্ভাবনা এবং নিজের আকাঙ্ক্ষা অনুসারে জীবন ও নিজের জগৎ গড়ার সামর্থ্য। আপনার মাঝে যে সম্ভাবনা রয়েছে তা হাজার জীবন কাটিয়েও পুরোটা ব্যবহার করতে পারবেন না।

আপনি এ পর্যন্ত যা অর্জন করেছেন সেটিই সব নয়; এটি আপনি কী করতে পারেন তার এক চিহ্ন মাত্র। বর্তমানে আপনি আপনার স্বাভাবিক প্রতিভা ও সক্ষমতাকে যতই পরিচর্যা করতে থাকবেন, আপনার ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও ততই বাড়বে।

আপনার অসীম সম্ভাবনায় আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে। তাহলেই আপনি আপনার সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারবেন। যা হওয়ার সম্ভাবনা আপনার মধ্যে ছিল আপনি তা হতে পারবেন ।

৪. আপনিই আপনার জগৎ তৈরি করেন আপনার চিন্তার মাধ্যমে, এবং আপনার এই চিন্তা যত সুদৃঢ় সেই জগত ততই বাস্তব। আপনার বিশ্বাসই বাস্তবতার সৃষ্টি করে, প্রতিটি বিশ্বাস-ই আপনার জগৎ তৈরি করে – এমনকি বাল্যকালে শেখা বিশ্বাসও। আর মজার তথ্য হলো এই যে বেশিরভাগ নেতিবাচক কিংবা নিজেকে সীমাবদ্ধকারী বিশ্বাসের, যা আপনার সাফল্য ও সুখী জীবনের প্রতিবন্ধক, কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।

যখনই আপনি নিজেকে সীমাবদ্ধকারী এসব বিশ্বাসকে প্রশ্ন করতে শুরু করবেন তখনই দেখবেন এসব বিশ্বাস পালাচ্ছে – আর আপনি নিজেকে এক আকর্ষণীয়, গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে অনুভব করতে শুরু করছেন; এগিয়ে যাচ্ছেন সাফল্যের পথে, প্রশান্তির পথে, সমৃদ্ধির পথে।

৫. আপনি কী নিয়ে চিন্তা করবেন আর আপনার জীবনকে কোনদিকে নিয়ে যাবেন তা বাছাই করার পুরো স্বাধীনতা আপনার। আপনার চারপাশে যাই ঘটুক না কেন – আপনার মনোজগতের একচ্ছত্র অধিপতি আপনি। আপনার অন্তর্জগত আপনার চিন্তা-পদ্ধতির উপর আপনার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ; এটি  আপনার বসের কিংবা বাড়ির কর্তার উপর নির্ভরশীল নয়। আপনি নির্ধারণ করতে পারেন আপনি কী ভাববেন – সুখী, পরিপূর্ণ, ভাল ভাবনা আপনাকে ইতিবাচক কাজ ও ফলের দিকে চালিত করবে। আবার, অনেকেই যেমন করেন, নেতিবাচক চিন্তা করতে পারেন; নিজেকে সীমাবদ্ধকারী চিন্তা আপনাকে পেছনের দিকে টেনে নিয়ে যাবে; আটকে রাখবে খাঁচার মধ্যে।

আপনার মন একটি বাগানের মতো: সেখানে ফুলের চাষ না করলে আগাছা জন্মাবে আপনাআপনি; আগাছাই দখল করে নেবে পুরো বাগান। আপনি যদি সচেতনভাবে ইতিবাচক চিন্তার চাষ না করেন, তাহলে নেতিবাচক চিন্তা দখল করে নেবে আপনার মন।

এই বাগানের রূপকই বলে দেয় কেন এত মানুষ অসুখী, এবং তারা জানেও না তারা অসুখী কেন।

৬. এ জগতে আপনার রয়েছে এক মহৎ গন্তব্য; আপনার জীবনে চমৎকার কিছু করার জন্য আপনার জন্ম হয়েছে। আপনার মধ্যে রয়েছে প্রতিভা, সক্ষমতা, আইডিয়া, অন্তর্দৃষ্টি এবং অভিজ্ঞতার এক অদ্বিতীয় সমন্বয় – যা আপনাকে অন্যদের থেকে ভিন্ন করে তোলে। আপনি এক ও অদ্বিতীয়, আপনার সমতুল্য কেউ আগেও জন্ম নেয়নি, নেবেও না। আপনাকে তৈরি করা হয়েছে সাফল্যের জন্য, আপনার মধ্যে দেয়া হয়েছে মহত্ত্বের বীজ।

আপনার জীবনে বড় লক্ষ্য নির্ধারণ, দুর্গম পরিস্থিতিতেও লেগে থাকার ক্ষমতা, আপনার অর্জনের উচ্চতা এবং জীবনের পুরো গতিপথ নির্ধারণ নির্ভর করছে আপনি এই ধারণাকে কীভাবে গ্রহণ করছেন কিংবা করছেন না তার উপর।

৭. আপনি কী করতে, হতে কিংবা পেতে পারেন তার কোনো সীমা নেই, কেবল সেসব সীমা-ছাড়া যা আপনি নিজেই আপনার চিন্তা ও কল্পনার উপর আরোপ করেছেন। আপনার বড় শত্রু হলো আপনার সন্দেহ ও ভয়। এসব হলো নেতিবাচক বিশ্বাস, যা সত্যের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা নয়, অথচ আপনি তা বিনা প্রশ্নে বছরের পর বছর মেনে নিয়ে এসেছেন – এমনকি প্রচারও করেছেন।

টেমপেস্ট এ শেকসপীয়র লিখেছেন, অতীত হলো এক অবতরণিকা। অতীতে আপনার প্রতি যা কিছু ঘটেছে তা আপনার সুন্দর ভবিষ্যতের এক প্রস্তুতি মাত্র। আপনি যদি সেই অতীতে আটকে থাকেন তাহলে সামনের সুন্দর জীবন অধরাই রয়ে যাবে।

একটিমাত্র নিয়ম মনে রাখুন: কোথা থেকে আসছেন সেটি ব্যাপার না, সেটিই ভাববার বিষয় কোথায় আপনি যেতে চান।

মিকেলেঞ্জোলোর ডেভিড

ইতালির মিলানে, একাডেমি অব ফ্লোরেন্সে গেলে দেখতে পাবেন দাঁড়িয়ে আছে মিকেলেঞ্জোলোর ডেভিড যা পৃথিবীর সুন্দরতম ভাস্কর্যসমূহের একটি বিবেচিত হয়ে এসেছে।

পরবর্তীতে মিকেলেঞ্জোলোকে নাকি জিজ্ঞেস করা হয়েছিল এত সুন্দর ভাস্কর্য তিনি কীভাবে তৈরি করলেন। তিনি ব্যাখ্যা করলেন। একদিন তিনি তাঁর স্টুডিওর পথে হেঁটে যাচ্ছিলেন। তখন দেখলেন রাস্তার পাশে মার্বেল পাথরের বিশাল এক চাঁই রাখা আছে। কেউ এনেছে। এরপর ঘাস আর আগাছা জন্মেছে।

এরপরও তিনি অনেকবার সেই পথ ধরে হেঁটে গেছেন। কিন্তু একদিন সকালে যাওয়ার পথে তাঁর মনে হলো, এটাই তিনি চেয়েছিলেন। তিনি সেই পাথরকে তাঁর স্টুডিওতে নিয়ে এলেন তাঁর নূতন ভাস্কর্যের জন্য, যাতে চারবছর কাজ করার পর সেটি ডেভিড এ পরিণত হয়।

পরবর্তীতে তিনি বলেছেন, প্রথম দর্শনেই আমি সেই মার্বেল পাথরখন্ডে ডেভিডকে দেখেছিলাম। এরপর আমার প্রধান কাজ ছিল সেই পাথর থেকে ডেভিড বাদে আর সবকিছুকে ছেঁটে ফেলা, যতক্ষণ না কেবল নিখুঁত ডেভিড সেখানে থাকে।

এটি আপনারও গল্প

মিকেলেঞ্জোলো এক পাথর খন্ডে ডেভিডকে বন্দি দেখেছিলেন। আপনিও হয়ত তেমনি, বন্দি আছেন আপনার এই জীবনে – কিংবা কেবল রক্তমাংসের দেহে। আপনার জীবনের লক্ষ্য হবে সকল ভয়, সন্দেহ, অনিশ্চয়তা, নেতিবাচক আবেগ এবং মিথ্যা বিশ্বাস – যা আপনাকে পেছনে টেনে ধরছে – ছেঁটে ফেলা যতক্ষণ না আপনার মধ্যে কেবল খাঁটি আপনি থাকছেন, যে আপনি সফল, সচ্ছল, সুখী, সমৃদ্ধ।

আপনার কাজ হবে কুৎসিত ব্যাঙকেও চুমু খেতে শেখা – প্রত্যেক পরিস্থিতিতেই ভাল কিছু বের করতে শেখা এবং সেটিকে কাজে লাগানো; প্রতিটি নেতিবাচককে ইতিবাচকে পরিণত করা এবং আপনার জীবনের মধ্যে সেই সুদর্শন রাজপুত্রকে ফিরিয়ে আনা।

আপনি, এই মুহূর্তে, একটি সিদ্ধান্ত নিন যে আপনি আপনার পুরো সম্ভাবনাকে সাফল্য ও সুখী জীবনের জন্য কাজে লাগাতে যাচ্ছেন এবং আপনার মধ্যকার অনন্য মানুষকে বের করে আনছেন যা আপনার মধ্যেই লুকিয়ে আছে এতদিন। আপনি এ জীবনে যা কিছু ভাল, মহৎ, সুন্দর কাজ করার জন্য এসেছেন তা সম্পন্ন করতে যাচ্ছেন। কীভাবে করবেন তা শিখবেন আরো একটু সামনে। এগুতে থাকুন আমার সাথে।

এখুনি করুন

আপনার জীবনে নিজেকে-সীমাবদ্ধকারী নেতিবাচক চিন্তাসমূহকে চিহ্নিত করুন। এরপর প্রশ্ন করুন, এসব সত্য না হলে কী ঘটত?

আপনি যা হতে চান, যা করতে চান, তার জন্য প্রয়োজনীয় সকল প্রতিভা ও সক্ষমতা আপনার থাকলে আপনার জীবন কেমন হতো? আপনার যদি কোনো সীমাবদ্ধতা না থাকতো তাহলে কী ঘটত? আপনাকে যদি সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয়া হতো তাহলে নিজের জন্য কোন লক্ষ্য নির্ধারণ করতেন, এবং কোন কোন কাজ ভিন্নভাবে করতেন?

ব্রায়ান ট্রেসি’র Kiss That Frog অবলম্বনে রচিত

Series Navigationব্যাঙকে খাও চুমু! >>

Leave a Reply

%d bloggers like this: