আসক্তি

অনেক কিছুতেই আমাদের আসক্তি থাকে। ভালো মন্দ দুটোর ক্ষেত্রেই। কিছু কিছু আসক্তি দেখলে ভালোই মনে হয়। তাই আমরা সেগুলিকে প্রশ্রয় দিই। যেমন ধরুন কফি পান। সকালে এক মগ, দুপুরে এক মগ আর সন্ধ্যায় এক মগ। ভালোই তো। অনেক গবেষণা দেখিয়ে বলতে পারবেন কফি পান স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। অবশ্যই ভালো। তবে এটা যদি আসক্তিতে রূপ নেয় তাহলেই সমস্যা। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে কিংবা নাশতার পর ধুমায়িত কফি না পেলে যদি আপনার মেজাজ খিঁচড়ে যায় কিংবা দিনটাই মাটি হয়ে যায় কিংবা রাত দুপুরে উঠে যদি মনে হয় কফি পান না করলে আর ঘুমুতে পারছেন না তাহলে সেটা আসক্তির পর্যায়েই। সেটাই আসক্তি নয় যেটাকে আপনি ইচ্ছে করলেই বাদ দিতে পারেন। এরকম আরো উদাহরণ দেয়া যায়।

বই পড়া খুবই ভালো কাজ। আমি বই পড়তে ভালোবাসি, অন্যকে পড়তে উৎসাহিত করি। কিন্তু এটা যদি আসক্তির রূপ নেয়, বই পড়তে শুরু করলে আর কিছুই যদি করতে না পারেন কিংবা বই পড়ার জন্য যদি আপনার প্রয়োজনীয় কাজগুলো নিয়মিতই বাদ দিতে হয়, অফিসের কাজে ক্ষতি হয়, পারিবারিক সম্পর্ক হারিয়ে যায় তাহলে সেটি ক্ষতিকর। অন্য নেশার মতোই।

চা একটা সাধারণ পানীয়, আমার প্রতিদিনই পান করি। স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী, অনেকেই বলেন। কিন্তু প্রতিদিন চা পানই আসক্তির রূপ নিতে পারে। ক্লাশ সেভেন এইটে থাকতে নিজে এরকম নেশায় পড়েছিলাম। রাত বারোটায় মনে হলো এখন চা পান করতে হবে। হোস্টেলে থাকি। বাইরে দোকানপাট তখন বন্ধ। অনেক কষ্টে অন্যদের কাছ থেকে চা পাতা জোগাড় করা গেল। কিন্তু পানি গরম করার জন্য স্টোভ বা ওরকম কিছু নেই। তাই নিজের খাতার কাগজ ছিঁড়ে সেগুলি পুড়িয়ে কোনোরকমে পানি গরম করে চা পান করলাম। ঘরের মধ্যে এই কাগজ জ্বালানো যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তারপরও সেটি করেছিলাম, আসক্তির কারণে। সেটি দেখে আরেকজন তখনকার দাখিল পর্যায়ের বাংলা বইটি এগিয়ে দিয়েছিল। তাতে অবাক চা খোর নামে একটা গল্প ছিল। সে চা খোর ট্রেনের কম্পার্টমেন্টে চা বানাতে গিয়ে ট্রেনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। এরকম সব ‘খোর’ আসলেই বিপজ্জনক।

অফিসে যারা কাজ করেন তাদের জন্য নিয়মিত ইমেইল চেক করা জরুরী। এমনকি ব্যক্তিগত জীবনেও করা দরকার। কিন্তু সেটি করতে না পারলে যদি ঘুম না হয় বা খাবার খেতে ইচ্ছে না করে তাহলে সেটি আসক্তি। তেমনি সোশ্যাল মিডিয়া। মানি, এটা অনেকের সাথে যোগাযোগ ঘটিয়ে থাকে, আপনার বক্তব্যকে অনেকের কাছে পৌঁছে দেয়। কিন্তু ফেসবুকের মতো সোশ্যাল মিডিয়ার বড় অসুবিধা হলো এতে আপনি আসক্ত হয়ে পড়েন। একটু পর পরই আপনার ইচ্ছে করে ঢুকে দেখি কে কী বলছে, কোনটা হট টপিক, কোনখানে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে পারি। ব্যস, একটু ঢুকে কয় ঘণ্টা কাবার সেটির আর হিসেব থাকে না। একটু একটু পর পর ঢোকার ঝামেলা বাদ দিতে অনেকে একবারে ফেসবুকেই থাকেন; দিনে-রাতে সবসময় লগডইন, যে যাই করুক একটু পরপর নোটিফিকেশন। ওইটাই তখন তার জগৎ হয়ে যায়। এরকম ফেসবুক আসক্তিতে কতশত কর্মঘণ্টা যে নষ্ট হচ্ছে, কত যে অশান্তি সৃষ্টি হচ্ছে গবেষকরা নিশ্চয় তা বের করবেন।

এরকম ছোটখাটো আসক্তি, আপাতদৃষ্টিতে যা ভালো বলেই মনে হয়, তা আসলে আপনার আত্মনিয়ন্ত্রণকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে। সাহস করে, নিজের ইচ্ছেমতো, সেখান থেকে দূরে থাকতে পারেন না। প্রয়োজনে সেসব ছাড়তে পারেন না। সেসব আসলেই নির্দোষ হতো যদি সেগুলির প্রতি আপনার আসক্তি না থাকত, আপনি যদি এক বেলা কফি না খেয়ে দিব্যি থাকতে পারেন, প্রয়োজনের মুহূর্তে বইটা হাত থেকে নামিয়ে রেখে দিতে পারেন কিংবা ফেসবুক থেকে প্রয়োজনমতো দূরে থাকতে পারেন কেবল তাহলেই সেসব করতে যাওয়া উচিত। সেসব থেকে বিরত থাকার সাহস যদি আপনি হারিয়ে ফেলেন কিংবা আপনার শরীর কিংবা মন যদি সেসব থেকে বেরিয়ে আসতে বাধা দেয় তাহলে বুঝতে হবে আপনি তাতে আসক্ত। আর যেকোনো আসক্তিই খারাপ; খারাপ কাজে আসক্তিতো বটেই, ভালো কাজের আসক্তিও। এটা বুঝেই স্টইক দার্শনিকদের উপদেশ ছিল: তোমার আসক্তিগুলো চিহ্নিত করো এবং সেগুলো নির্মূল করো। সেটা করতে পারলেই তুমি বীর

আমরা আসক্ত এমন অনেক কিছুই আমাদের বাদ দিতে হবে, যদিওবা আমরা সেগুলিকে আমাদের জন্য ভালো বলে গণ্য করি। তা নাহলে সাহস হারিয়ে যাবে, যা ক্রমাগত আপনাকে পরীক্ষা করতে থাকবে। আত্মার মহত্ত্ব হারিয়ে যাবে, যা অন্য সবার মতো ছোটখাটো বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকলে বড় কিছু করার সুযোগ পাবে না।

সেনেকা, মোরাল লেটারস

যে নিজের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আসক্তিগুলোকে জয় করতে পারে না তাকে কৃতিত্ব দেব কিসের জন্য?

Series Navigation<< না বলুন অপ্রয়োজনীয় সবকিছুকেঅভিপ্রায় >>

Leave a Reply

%d bloggers like this: