মিজোশিমা-কাকাগাওয়া

ফুকুয়ামা থেকে জাহাজ ছেড়ে পৌঁছুলাম মিজোশিমায়। একদিনের পথ। মিজোশিমায় সমুদ্রের তীর ঘেঁষেই বিরাট স্টীল মিল। সেখানেই ভিড়েছে আমাদের জাহাজ। এখান থেকে স্টীল নেয়া হবে বাংলাদেশের জন্য। 

জাহাজ ভিড়তেই কোম্পানির স্থানীয় এজেন্ট এসে হাজির। নোটিশবোর্ডে একগাদা কাগজ টাঙিয়ে দেয়া হলো। মনোযোগ দিয়ে সেগুলি পড়তে শুরু করলাম। প্রথমটা সমুদ্রদূষণ রোধের জন্য। তাতে জানানো হয়েছে সমুদ্র অঞ্চল যাতে দূষিত না হয় সেজন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। বিল্জ বা ব্যালাস্ট আউট করা চলবে না। কোনো প্রকার আবর্জনা বা তেল পানিতে ফেলা যাবে না। সেজন্যে বিশেষ সতর্কবাণী লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। আরেকটা নোটিশ দেখলাম- শোরে যাওয়ার নিয়মকানুন। শোরে যেতে হলে ফ্যাক্টরি এলাকায় হাঁটা চলবে না, যেতে হবে ট্যাক্সি ভাড়া করে।

কিছুক্ষণ পরে জানলাম এখান থেকে শহরে যেতে ট্যাক্সি ভাড়া দেড়শো ডলার। শুনেই ডাঙায় নামার ইচ্ছে উধাও হলো। যারা কয়েক হাজার ডলার বেতন পান তারাও সাহস করবেন কি না সন্দেহ।

শোর পাস পেলাম। শোর পাস দিতে এসে স্টুয়ার্ড মুজিব মুচকি হেসে বলল, স্যার, শোরে যাইবেন নি? জবাব না দিয়ে শুধু শোর পাসটা নিই এবং সেটা ভালভাবে দেখি। সৌরভ বলল, ‘ওটা ভালভাবে দেখে নিয়েই শোরে যাওয়ার সাধ মেটা!’ তাই করতে হলো।

শোরে যখন যাওয়া গেল না তখন আর কি করা, চিঠি এসেছে কি না সেই খোঁজ করা যাক। যদিও জানি এ ঠিকানায় চিঠি আসবে না। কারণ এখানকার ঠিকানা কাউকেই জানানো হয়নি। আমাদের যাওয়ার কথা কোবেতে। কিন্তু চীনে এসেই শুনলাম কোবেতে ভয়ঙ্কর ভূমিকম্প হয়েছে। ভূমিকম্পে পোর্ট প্রায় শেষ। ওখানে জাহাজ যাবে না। সবাইকে ঠিকানা দিয়েছি কোবের। ফুকুয়ামায় এসে চিঠি পেলাম না। কোবের চিঠিপত্র ফুকুয়ামায় পাওয়ার কথা। কিন্তু জানলাম, কোবেতে কোম্পানি এজেন্টের অফিসও ধ্বংস হয়েছে, সেই সাথে আমাদের চিঠিপত্রও। হায়রে কপাল! চিঠি লিখে কেউ হয়তো উত্তরের অপেক্ষায় আছে দেশে। সে জানবে কি করে যে তার চিঠির সলিল সমাধি নয়, ভূমিতেই সমাধি হয়েছে। তবু ভেবেছিলাম ভূমিকম্পের পরও তো চিঠি এসে পৌঁছুতে পারে। ধন্য আশা কুহকিনী, তোমার মায়ায় …। খোঁজ নিয়ে দেখলাম কারও কোনো চিঠি আসে নি।

দেশে থাকতে আমার চিঠি পাওয়া দেখে অন্যরা হিংসে করত। এখন উল্টো। সৌরভ চীনে পেয়েছে দুটো চিঠি। ও মনের আনন্দে চিঠি পড়ে, আমি হাঁ করে দেখি। আহা, আমাদেরও যদি এরকম চিঠি আসত! চিঠি যে কত আকাঙ্ক্ষিত তা এখন বুঝছি। তবু চিঠি লেখার ইচ্ছেটা ক্রমেই উধাও হচ্ছে। জোর করে কাগজ কলম নিয়ে বসলেও দু’লাইনের বেশি লিখতে পারি না। শুধু মনে হয় কী হবে লিখে, উত্তর তো পাব না।

মাঝে মাঝে বেশ খারাপ লাগে। এটা কোন জীবন? সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ঘুরে বেড়ানো, মাটির সাথে সম্পর্ক নেই। মাটির সাথে সাথে সম্পর্ক না থাকলে কি মানুষ হওয়া যায়? মনে হয় না! আমাদের গ্রীজার সলিমদ্দি সে কথাই বলছিল। ‘সাব, সীম্যানরা হইল অন্যজাত। এরা মানুষ না’।

প্রশ্ন করেছিলাম, কেন? অন্য জাত কেন?

সে বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে জবাব দিল, বুঝবেন সাব, বুঝবেন। আর কিছুদিন যাক। এ লাইনে যখন আইছেন, তখন টের পাইবেন সীম্যান কারে কয়। তিরিশ বছরের সীটাইমে কম দেখলাম না।‍ বলেই একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।

বুঝলাম এরপর শুরু হবে তার তিরিশ বছরের নাবিক জীবনের বয়ান। বলবে কেন সে এই পেশায় এল। বুঝলেন সাব, বি.এ. পাশ করার পর কোনমতে গ্রামের স্কুলে মাস্টারি করবার লাগলাম। অল্প মাইনা, তাও সময়মতো দেয় না। ছয়মাস চাকরি করার পর পাইলাম একমাসের বেতন। সংসার চালামু কেমনে? এমনে করেই দুই বছর চালাইলাম। তারপর একদিন আল্লায় দিলে পথ পাইয়া গেলাম। কিছু টাকা খরচ কইরা নলি বানাইলাম, ঢুইকা গেলাম এই কাজে। জাহাজে আইসা পেরথম পেরথম বাড়ির জন্য মনটা আনচান করতো। তারপর সব ভুইলা গেলাম। অহন বাড়িতে গেলে নিজেরে খাপছাড়া রাগে। থাকবার পারি না, তাড়াতাড়ি জাহাজে ফিইরা আসি। সীম্যানগো লাইফে বাড়ির জন্যি মায়া থাকতি নাই। আপনে নতুন আইছেন, কয়েকবছর পর সব ঠিক হইয়া যাইব।

সব ঠিক হয়ে যাবে মানে? আমিও কি ভুলে যাব সব? বাড়ির জন্য কোনো টান থাকবে না? মাটির জন্য কোনো মায়া থাকবে না? বাবা-মা-ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন কারও কথা ভেবে মন খারাপ হবে না? ভুলে যাব দেশের কথা, গাছ-পাখি আর নদীর কথা?

এখানে এসে সবুজ ধানক্ষেত দেখিনি অনেকদিন। শীত-বসন্ত-বর্ষা কোন ঋতু কখন আসছে, কখন যাচ্ছে তাও বুঝতে পারি না। সলিমদ্দির কথাই হয়তো ঠিক! বিচ্ছিন্নতাই আমাদের ভবিষ্যত্‍। সম্ভবত সেই প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে।

দেশে থাকতে প্রতিদিন কোথায় কী ঘটল তা জানার প্রচন্ড আগ্রহ ছিল। পত্রিকা না পড়লে দিন কাটত না। এখন ওসব চিন্তা মাথায় আসে না। আসার সময় একগাদা বই সাথে নিয়ে এসেছি। তারমধ্যে বঙ্কিম রচনাবলী ও শরৎ রচনাবলী আছে। তাই দেখে আমার এক জ্যেষ্ঠ্য কর্মকর্তা ব্যঙ্গ করে বললেন, লাইক টু বি আঁতেল? প্রচন্ড রাগ হচ্ছিল শুনে, কিন্তু কিছু বলতে পারলাম না। হাজার হলেও তিনি আমার সিনিয়র। রাগ হলেও কিছু বলা যাবে না, আপোস করে চলতে হবে। এটাই হলো আসল শিক্ষা। এই শিক্ষা যে রপ্ত করতে পারেনি তার স্থান পৃথিবীতে নেই। বিলুপ্ত ডাইনোসরের চেয়ে তেলাপোকাই শ্রেষ্ঠ, মানতেই হবে।

আপোস তো করতেই হচ্ছে প্রতিনিয়ত। নানা স্ববিরোধিতার মাঝেই বেঁচে থাকতে হচ্ছে। নামাজের সময় হলে মাথায় টুপি দিয়ে পাক্কা মোল্লা, এবং পরক্ষণেই পাক্কা জুয়াড়ি, মদ্যপ এবং নারী সন্ধানী। নিজেকে জুয়াড়ি বলতে ভাল্লাগে না। জুয়া না খেলে এখানে খেলা হয় বিঙ্গো। নামটা ভাল শোনায়। বলা হয় সময় কাটানোর জন্য খেলছি। কিন্তু টাকা পয়সার ব্যাপারে কোনো শিথিলতা নেই। খেলতে হলে টাকা লাগবেই। পুরষ্কার না পেলে মনও খারাপ হয়। আমি এই খেলার কিছু জানি না। না জানাটা অপরাধ। বিইং আ সীম্যান ইউ ডোন্ট নো হাউ টু প্লে বিংগো? ইউ আর রিয়েলি আ শিট! হাত ধরে তারা শেখাতে থাকে খেলার অ আ ক খ। শিখেও যাই অল্প সময়ে। তবু শুধু খেলা দেখি, খেলি না। একজন গর্জন করে ওঠেন, হোয়াই ইউ আর নট প্লেয়িং? পাশ থেকে আরেকজন টিপ্পনি কাটে, টু মাচ পায়াস! না, পায়াস আমি নই! কোনোদিন দাবিও করি না। বলি, টাকা নেই। টাকা নেই তাই বলে খেলব না, তাদের কাছে এটা কোনো যুক্তি নয়। বলে, মানি ইজ নো প্রোবলেম! আমাদের এক রাষ্ট্রপতিও বলেছিলেন ও কথা। আমার অফিসারের স্বরটাও তেমনি। বলেন, আমি দিচ্ছি টাকা। তিনি নিজে টাকা দেবেন, তবু আমাকে খেলতে হবে।

আমাকে একটা শীট কিনে দেয়া হলো। সেই সাথে বলা হলে লাভের অর্ধেকটা ঋণদাতার। খেলতে শুরু করেই একবার জিতে যাই। ঋণদাতা মহাখুশি। তারপর দুইবার লাভের খাতা শূণ্য। ঋণদাতা বিরক্ত হয়ে বলেন, তোমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না।

কথাটা অনেকেই বলে। আত্মীয় স্বজনরা আমার উপর আস্থা হারিয়েছে। তাদের জন্য কিচ্ছু করতে পারলাম না। শুধু গাদা গাদা বই পড়ি। এটা আমার মহা অপরাধ। আইএ বিএ পাস করার পর অত কিসের পড়া বাপু? একজন তো আমার সব বই পুড়িয়ে ফেলতে চেয়েছে। ভয়ে বই পার করেছি এক বন্ধুর বাসায়। এখন লুকিয়ে পড়ি। মনে হয় কোনো নিষিদ্ধ কাজ করছি। অভ্যেসটা ছাড়তে চাই, তবু পারি না। জাহাজে এসেও সেই একই অবস্থা।

বাইরে যাওয়া নেই। জাহাজে বন্দি সবাই। খাওদাও, টিভি দেখো। বিংগো খেলো। টিভিতে ইংরেজি কিছু নেই। জাপানীদের দেখতে খুব একটা ভাল লাগে না। চালাও ভিসিপি। ছবি দেখো। অবশ্যই হিন্দি ছবি, বাংলার নাম করো না। বাংলা কেউ দেখে নাকি! ওটি খাওয়া যেতে পারে, দেখা নয়! একটাই বাংলা ছবি আছে জাহাজে। সেটা দেখা যায়তো শোনা যায় না, শোনা গেলে দেখা যায় না। বরং হিন্দি দেখো। দেখো, কি সুন্দর নাচছে এক নম্বর মিনাকশী দেবী। বাংলায় মিনাক্ষী বলা মেরিনারদের সাজে না। ছবি ভাল্লাগে না, বোরিং। চালাও গীতমালা; চোলিকা পিছে কেয়া হ্যায়… । বাচ্চা দুটো তাই দেখে নাচতে থাকে।

এভাবেই দুদিন কেটে যায়। তারপর চলে আসি নতুন বন্দরে। মিজোশিমা থেকে কাকাগাওয়ায়। এখানেও স্টীল মিল। একই অবস্থা। হাঁটা চলবে না।

জাহাজ ভেড়ার আধঘণ্টার মধ্যে চারপাশে অয়েলগার্ড দেয়া হলো, যাতে তেল পড়লে ছড়িয়ে পড়তে না পারে। সবাই ভয়ে ভয়ে আছে। সামান্য তেল কিংবা আবর্জনা পানিতে পড়লেই বিপদ। তাতে জরিমানা হবে, অনাদায়ে জাহাজ আটক।

সলিমদ্দি এ ব্যাপারে বেশ সতর্ক। প্রায়ই বলে, স্যার জাপানে কখনো বিলিজ আউট করবেন না। ধরা পড়লে জেলে ভইরা রাখব। বিল্জ আউট করার ব্যাপারে তাই বেশ সতর্ক থাকতে হয়।

কাকাগাওয়াতে সমুদ্রের ধার ঘেঁষেই বন্দর। এ অঞ্চলে হারিকেনের প্রাদুর্ভাব খুব বেশি। সেজন্য সবসময় সতর্কাবস্থায় থাকতে হয়। জাহাজ যাতে আধ ঘণ্টার নোটিশে বন্দর ছাড়তে পারে সে জন্য রেডি থাকতে হয়। কোনো কারণে তা করতে না পারলে বন্দর কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। তাদের টাগবোট প্রস্তুত থাকবে জাহাজকে বন্দর থেকে সমুদ্রে নেয়ার জন্য। ঝড়ের পূর্বাভাস পেলেই সব জাহাজ চলে যাবে সমুদ্রে।

বাইরে প্রচণ্ড শীত। তাপমাত্রা শূণ্য ডিগ্রি বা তার নিচে। এমন শীতে বাইরে বেরুনোর প্রশ্নই ওঠে না। গরম পানিতে গোসল করা হচ্ছে। একোমোডেশনে হিটিং চলছে। এছাড়া বাঁচার উপায় নেই।

অন্যসময়ে ইঞ্জিনরূমে গরমের চোটে থাকা যেত না। কিন্তু এখন ইঞ্জিনরূম বেশ আরামের জায়গা বলে মনে হয়। ইঞ্জিনরূমের সবচেয়ে উত্তপ্ত স্থান হলো বয়লার এরিয়া। এমনি সময়ে বয়লার চালু অবস্থায় এখানে এসে দাঁড়ানো যায় না। বাতাস সব উধাও হয়ে যায়, নি:শ্বাস নেয়া যায় না, এত গরম। কিন্তু এখন সেই উত্তাপ নেই। বাইরে থেকে এসে শীতে আগুন পোহানোর মতো করে বয়লারের গায়ে হাত রেখে শীত দূর করার চেষ্টা করি। তবু শীত দূর হয় না।

ডেক থেকে আলী কখনও ইঞ্জিনরূমে আসে না। ইঞ্জিনরূমে আসলেই না কি তার মাথা ঘোরে। এখন দেখি সেও বয়লার ফ্লোরে এসে দিব্যি আঁচ পোহায়। বয়লার ব্লোডাউন করতে গিয়ে দেখা হয় তার সাথে। সে বিস্ময় ভরে বয়লারের দিকে তাকায়। তাকে জিজ্ঞেস করি, এটা কি জানো মিয়া?  আলী মাথা নাড়ে। বলি, এটা হলো বয়লার। এটি চলছে বলেই একোমোডেশন গরম আছে, গরম পানি পাওয়া যাচ্ছে। শুনে সে তড়িঘড়ি করে বলে, ও বুঝেছি। এর মধ্য দিয়েই গরম পানি উপরে যায়।

তার কথা শুনে হেসে উঠি। ব্যাপারটা মোটেই সেরকম নয়। ওখানে পানি ফুটিয়ে বাষ্পে পরিণত করা হয়। সেই বাষ্পকে খাবার পানির ট্যাংকের মধ্য দিয়ে চালানো হয়। বাষ্পের উত্তাপ গ্রহণ করে পানি গরম হয়। এই ব্যাপারটা আলীর মাথায় এখন ঢোকানো যাবে না। কারণ সে আমার কথা বিশ্বাসই করবে না। তার বস তাকে সবসময় বলে, ডোন্ট মিক্স উইদ ইঞ্জিনিয়ারস! দে আর ডার্টি লাইক এনিথিং। এই ডার্টিরাই যে জাহাজটাকে চালু রাখে তা তিনি ভেবে দেখেন না। আজ আলীকে সে কথা বলতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু বললাম না। কি হবে তাকে বলে; বরং তার বসকে বলতে পারলে একটা কাজের মতো কাজ হতো।

এমনিতেই প্রচন্ড শীত। তারপর বাইরে যাওয়ার নিষেধাজ্ঞা। তাই জীবনটা বিশ্রি লাগে। বিঙ্গোর আড্ডায় নিজেকে মানিয়ে নিতে পারিনা। টিভি দেখার সুযোগও তেমন হচ্ছে না। তাই রুমে বসে থাকি। দু’একটা বই উল্টাই। আর বিকেলে ডিউটির সময় একটি বই নিয়ে ইঞ্জিনরুমে নামি। সন্ধ্যায় গ্রিজার শাহাবুদ্দিন আর আমি ছাড়া কেউ থাকে না। গ্রিজার শাহাবুদ্দিনকে চা বানাতে বলি। সে চা বানাতে বানাতে বলে, স্যার চলেন, আমরা জাপানে নাইমা যাই।

কীভাবে নামবেন?

সে চিন্তা আপনাকে করতে হবে না। রাজি থাকলে কন, আপনার ব্যবস্থা করি।

তার কথা শুনে মনে হলো তার ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়ে গেছে। জাহাজের অন্যান্যদেরও ধারণা শাহাবুদ্দিন এবার জাপানে আস্তানা গাড়বে। সে আগের পোর্টগুলোতে কিছুই কেনাকাটা করেনি। সেজন্যই তাকে সবাই সন্দেহ করছে। কয়েকদিন আগে আমাদের সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার শাহাবুদ্দিন, একসাথে দেশে ফিরতে পারবো তো?

প্রশ্ন শুনে শাহাবুদ্দিন বলেছিল, সেইটা তো আল্লাহর ইচ্ছা, স্যার। এখন বুঝলাম আল্লাহর ইচ্ছা হোক বা না হোক শাহাবুদ্দিনের অনিচ্ছা ষোলআনা।

তাকে বলি, আপনি না হয় জাপানী মানুষ। জাপানে থাকলে অসুবিধা হবে না। কিন্তু আমায় তো ধরে ফেরত পাঠাবে দেশে। তখন কী হবে?

শাহাবুদ্দিন বেশ জোরের সাথেই বলে, ‘রিস্কতো নিতেই হবে স্যার। একবার টিইক্যা গেলে মাসে মাসে লাখ টাকা কামাইবেন।’

তার লাখ টাকা কামানোর পরিকল্পনায় সায় দিতে পারি না। নিজ দেশ ছেড়ে অন্যদেশে মজুরগিরি করব এটা আমি ভাবতেই পারি না। নিজ দেশে না খেয়ে মরলেও সুখ আছে।

চায়ের পেয়ালায় শেষ চুমুক দিয়ে বিনয় ঘোষের মেট্রোপলিটন মন, মধ্যবিত্ত বিদ্রোহ বইটিতে নজর দিই।

শাহাবুদ্দিন বিড় বিড় করে বলে, ‘স্যার সারাক্ষণ কি যে পড়েন!’ এই বলে সে কন্ট্রোলরুম থেকে বেরিয়ে যায়।

আমার ওয়াচের শেষে ব্রিজ থেকে ফোন আসে। বলা হয়, আগামীকাল ভোর ছটায় সাহাজ সেইল করবে ইয়োকোহামার উদ্দেশ্যে। তার আগেই ইঞ্জিন রেডি করতে হবে। সৌরভ আসলে কথাটা জানিয়ে দিই।

[রহস্যপত্রিকা / ১৯৯৭ এ প্রকাশিত]

Series Navigation<< ইয়োকোহামাফ্যাঙচ্যাঙগ্যাঙ >>

Leave a Reply

%d bloggers like this: