আগামীকাল? কখন?

প্রতিদিন কত কাজই তো করেন। তারপরও কাজ শেষ হয় না, একটা শেষ না করতেই আরেকটা এসে হাজির হয়। এই সমস্যাটা সবার। আর তাই অনেকেই ভাবি থাক এই কাজটা আগামীকাল করব। এটি ভাবা খারাপ না। আসলে অনেক কাজ আছে যেগুলি আজকে না করে আগামীকাল করাই ভাল; আবার কিছু কাজ আছে যেগুলি কোনোদিন না করলেই ভাল! তবে যখন কোনো কাজ আগামীকাল করবেন বলে ঠিক করেন তখন সেই কাজটি কি সত্যিই আগামীকাল করা হয়ে ওঠে? বেশিরভাগের ক্ষেত্রেই সেটি হয় না; আমার নিজেরও না। কারণ আমরা আগামীকাল ঠিক কোন সময়ে সেই কাজটি করব তা নির্ধারণ করি না।

আমাদের পরিকল্পনা যদি পরিষ্কার হয় তাহলে সেটি করার টান থাকে; সেটি সময়মতো করা হয়ে ওঠে। কিন্তু যদি ‘আগামীকাল’ এর মতো অনির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে দেয়া হয় তাহলে সেটির প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা কমে যায়। তাই যখনই আগামীকাল কিছু করতে চাইব তখনই উচিত হবে সেই কাজটির জন্য একটি সময় নির্ধারণ করে দেয়া। আপনার ক্যালেন্ডারে গিয়ে সেটির জন্য একটি সময় নির্ধারণ করে দিন; পারলে কোথায় করবেন সেটিও ঠিক করে দিন। গবেষণায় দেখা গেছে কোনো কাজের জন্য সময় ও স্থান নির্ধারণ করা হয়ে গেলে সেটি করা সহজ হয়ে ওঠে।

দ্য পাওয়ার অব ফুল এনগেজমেন্ট  নামে একটি বই আছে। সেখানে বলা হয়েছে পারফরম্যান্স ভালো করার জন্য আসলে কর্মীর কর্মশক্তিকে ম্যানেজ করতে হবে, সময়কে নয়। টাইম ম্যানেজমেন্টের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো কর্মশক্তিবা এনার্জি ম্যানেজ করা। বৃথা এনার্জি খরচ করা কিংবা যে কাজের একম দরকার নেই সেখানে না খরচ করে দরকারী কাজে খরচ করার কথাই বলা হয়েছে। এই বইয়ে এক গবেষণার কথা বলা হয়েছে। একদল নারীকে স্তন ক্যান্সার পরীক্ষার কথা বলা হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে বলা হয়েছে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে এটি সম্পন্ন করতে; আর কয়েকজনকে বলা হয়েছে একটি নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট সময়ে সেই পরীক্ষা সম্পন্ন করতে। পরে দেখা গেলে যাদের জন্য দিন ও সময় নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে তাদের শতকরা একশতভাগ সেই পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে; আর যাদের জন্য দিন ও সময় নির্ধারণ করা হয়নি তাদের অর্ধেক সেই পরীক্ষা করেন নি। আমাদের বাস্তব জীবনে তাকালেও তেমনি দেখতে পাবেন। যতক্ষণ দিন-ক্ষণ নির্ধারণ করে দেয়া না হচ্ছে ততক্ষণ সেই কাজ হচ্ছে না।

আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, একদল মাদকাসক্ত চিকিৎসার সময় একটি রচনা লিখতে রাজি হয়েছে। তাদের কয়েকজনকে বলা হয়েছে পরেরদিন বিকেল পাঁচটার মধ্যে রচনাটি লিখে শেষ করতে হবে। আর বাকি কয়জনকেও সেই সময়ের মধ্যে লিখে রচনা জমা দিতে বলা হয়েছে তবে তাদের কাছ থেকে জেনে নেয়া হয়েছে কখন এবং কোথায় তারা সেটি লিখবে। যারা কখন ও কোথায় তা লিখবে নির্ধারণ করতে পেরেছে তাদের শতকরা আশি ভাগ সেই রচনাটি লিখেছে; কিন্তু যাদের কেবল সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে তাদের কেউই লিখেনি।

একটু চিন্তা করে দেখলে বুঝতে পারবেন যে কোনো কাজ করার ইচ্ছা ব্যক্ত করাই যথেষ্ট নয়; আপনি আসলে সেই কাজটি করার প্রতি মনোযোগ দিচ্ছেন যখন সেই কাজটি কখন ও কোথায় করবেন তা নির্ধারণ করছেন। আমার প্রায় প্রত্যেকেই করণীয়ের তালিকা বা টুডু-লিস্ট বানাই। এই টুডু লিস্ট আসলে আমাদের হাতের কাজগুলির তালিকা। এই তালিকা লম্বা হতে থাকে আমরা ঘাবড়াতে থাকি। দিনশেষে দেখতে পাই টুডু-লিস্টের অনেক কিছুই করা হয় নি। যদি সত্যিই এই কাজের তালিকা থেকে উপকৃত হতে চান তাহলে প্রথমে সেই তালিকা তৈরি করুন; এরপর তালিকার মধ্যকার কাজগুলির অগ্রাধিকার বা গুরুত্ব নির্ধারণ করুন। এরপর একেকটি কাজকে ক্যালেন্ডারে নিয়ে গিয়ে বসান। কোন সময় কোনটি করবেন, কোথায় করবেন সেটি নির্ধারণ করে ফেলুন। এটি করতে গিয়ে আপনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলিই পাবেন – কারণ ক্যালেন্ডারে আপনার জায়গা সীমিত; দিনে আট ঘন্টার মতো কাজের সময় পাবেন – তার মধ্যেই যেগুলিকে জায়গা দিতে পারবেন সেগুলি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ হতে হবে। বাকি সেসব কাজ সেদিনের ক্যালেন্ডারে জায়গা দিতে পারবেন না সেগুলিকে পরেরদিন কিংবা তার পরেরদিনের ক্যালেন্ডারে যোগ করুন।

ক্যালেন্ডারে এভাবে কাজের তালিকা বসাতে থাকলে আরেকটি বিষয় উপলব্ধি করতে পারবেন। আপনি আসলে যেসব কাজ করতে চাচ্ছেন সেগুলি সত্যিই আপনার পক্ষে করা সম্ভব কি না তা পরিষ্কার হবে। যখন দেখবেন ক্যালেন্ডারে আঁটাতে পারছেন না তখন এটি পরিষ্কার যে কিছু কাজ আপনাকে বাদ দিতে হবে কিংবা অন্যের মাধ্যমে করিয়ে নিতে হবে।

কোন কোন কাজ আপনি সেদিন করতে পারছেন না সেটি জানাটা আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আপনি বিশাল পরিকল্পনা করলেন আর দিনশেষে দেখলেন যে তার অর্ধেকও করতে পারেন নি – এটি মোটেই উৎসাহব্যঞ্জক কিছু নয়। এরকম হলে অনেকেই উৎসাহ হারিয়ে ফেলে – সারাদিন কী করলাম ভেবে অস্থির হয়ে পড়ে। আর আগেই যদি জানতে পারেন সেগুলি করতে পারবেন না – তাহলে সেই অপরাধবোধ কিংবা ব্যর্থতাবোধ থাকবে না।

এই কাজের তালিকা তৈরি ও সেগুলিকে ক্যালেন্ডারে যোগ করবেন কখন? অবশ্যই দিনের শুরুতেই – শুরুতে মানে অফিসে এসে প্রথমে ইমেইল চেক করার আগেই। তাহলেই পুরো দিনের পরিকল্পনা হয়ে যাবে। আর একবার ইমেইল চেক করতে শুরু করলে দেখবেন দিনটি অগোছালোই থেকে যাচ্ছে। অনেকে আগের দিন রাতেই পরের দিনের পরিকল্পনা করে ফেলেন এবং দিনের শুরু থেকেই সেই পরিকল্পনা মতো কাজ করতে থাকেন। আরো মনে রাখতে হবে যে, কাজের পরিকল্পনা করাটাই বড় কথা নয় – সেই পরিকল্পনামাফিক কাজ করাটা গুরুত্বপূর্ণ।

মোদ্দা কথা:
যদি সত্যি কাজের তালিকা থেকে উপকৃত হতে চান তাহলে প্রতিটি কাজের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় ও স্থান নির্ধারণ করুন, তাহলে সেই কাজটি করা হয়ে উঠবে।



Also published on Medium.

Leave a Reply

%d bloggers like this: