এক ঘন্টার মাহাত্ম্য

সাফল্য ও ব্যর্থতার মাঝে পার্থক্য কী? না, খুব বেশি পার্থক্য নেই। সফল ব্যক্তি বলবেন তার কর্মপদ্ধতির কথা। আর ব্যর্থ ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করুন সে কেন ব্যর্থ। প্রথম উত্তর পাবেন ‘কিছু করার মতো যথেষ্ট সময় পাইনি’। হ্যাঁ, এটাই মূল কথা।

চব্বিশ ঘণ্টায় আমরা অনেক কাজ করি। খাই-দাই-ঘুমাই – আরো কতো কি! এরই মাঝে সফল ব্যক্তিরা সময় বের করে নেন। তারা কাজ চালিয়ে যান। যেমন মি. রহিম। কাজ করেন বেসরকারি সংস্থায়। সকাল আটটায় বেরিয়ে যান অফিসে। অফিসের কাজ সেরে বাসায় ফেরেন রাত আটটায়। তারপরও কাজ করেন কম্পিউটারে। তৈরি করেন বিভিন্ন সফটওয়্যার। লেখেনও মাঝে মাঝে। অন্যদিকে তারই বন্ধু মি. সেলিম, বেকার। সারাদিন কোনো কিছু করার সময় পান না। কারণ কী?

কারণ দুজনের জীবনাচরণে পার্থক্য। মি. রহিম নিয়ম মেনে চলেন কঠোরভাবে। রাতে ঘুমোবার আগে তার মাথায় থাকে আগামীকাল সকালে তাকে অফিসে যেতে হবে। সে অনুসারেই ঘুম ভাঙে তার। অন্যদিকে মি. সেলিম ঘুম থেকে উঠতে প্রায়ই দেরি করেন। কারণ, ঘুম ভাঙলেও উঠতে ইচ্ছে করে না। কাজ নেই হাতে, উঠে কী করবেন? ব্যস, এভাবেই হেলায় ফেলায় চলে যায় চব্বিশ ঘন্টা। ঘুমুতে যাবার আগে খুঁজে পান না সারাদিন কী করলেন।

তাহলে মোদ্দা কথা হলো সফলতার জন্য চাই নিয়মানুবর্তিতা। সময় নেই এ কথাটি একদম ভুয়া। কারোরই সময় থাকবে না, যদি না সে সময় বের করে নেয়। হ্যাঁ, শত ব্যস্ততার মাঝেও আপনাকে সময় বের করে নিতে হবে। কোনো বিষয়ে সফলতা পেতে চাইলে ওই সময়ে অনুশীলন করতে হবে আপনাকে। বেশি নয়, চব্বিশ ঘন্টায় এক ঘণ্টাই যথেষ্ট।

হ্যাঁ, মাত্র এক ঘণ্টা। এই এক ঘণ্টার মাহাত্ম্যে অনেকে পৌঁছে গেছেন সাফল্যের শিখরে। যেমন, ক্রফোর্ড গ্রিনওয়াল্ট। রাসায়ণিক পদার্থ উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান দ্যু পন্ড এর প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি। শত ব্যস্ততার মাঝেও প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে এক ঘন্টা ব্যয় করতেন হামিংবার্ড অধ্যয়নে। হামিংবার্ডের ছবি তৈরির যন্ত্রপাতি উদ্ভাবনে কাজে লাগাতেন এসময়কে। এরই ফসল হামিংবার্ডস বইটি, যা প্রকৃতিবিজ্ঞানের এক চিরায়ত গ্রন্থ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

তেমনি ছিলেন হুগো এল ব্ল্যাক। তিনি যুক্তরাষ্ট্র সিনেটে এসেছিলেন কলেজ শিক্ষা শেষ করেই। তারপর প্রতিদিন পড়াশোনা করতেন এক ঘন্টা। লাইব্রেরি অব কংগ্রেসে অর্থনীতি, ইতিহাস, দর্শন, সাহিত্য, ইত্যাদি বিষয় অধ্যয়ন চালিয়ে যেতেন এ সময়। বছরের পর বছর ধরে চলল তাঁর এই সাধনা। এরই মধ্যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে সুপ্রিম কোর্টের মি. জাস্টিস ব্ল্যাক হলেন। নাম কুড়োলেন বিচক্ষণ ও জ্ঞানী বলে। গোটা দেশ উপকৃত হলো তাঁর জ্ঞান ও বিচক্ষণতায়।

আপনি যদি কোনো বিষয়ে প্রতিদিন এক ঘণ্টা ব্যয় করেন তাহলে সারাবছরে তা দাঁড়াবে ৩৬৫ ঘন্টা, যা ৪৫টি কার্য দিবসের সমান। এভাবে আপনি বছরে দেড়মাস ব্যয় করতে পারেন কোনো সৃজনশীল কাজে। এতকিছু বলার পরও হয়তো আপনি বলবেন: এত ব্যস্ততার মাঝে একান্ত নিজের জন্য এক ঘণ্টা সময় বের করা খুবই কঠিন। সারাদিন কাজ করার পর ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে বাসায় ফিরি। তারপর বউ-বাচ্চাদের সময় দিতে হয়। এক ঘণ্টা সময় পাবো কোথায়?

পাবেন, আপনি ইচ্ছে করলেই পাবেন। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে এক ঘণ্টা বের করা তেমন কঠিন কিছু নয়। পরিকল্পিতভাবে সময় ব্যয় করলেই পারবেন। এই সময়টুকু আপনি অন্য কোনো কাজের ফাঁকেও বের করতে পারেন। যেমন আপনি যদি বাসে যাতায়াত করেন তাহলে সে সময়টুকুও কাজে লাগাতে পারেন। উদাহরণ হিসেবে আমি পরিচিত একজনের কথা বলতে পারি। আজ থেকে পাঁচ-ছয় বছর আগে তাঁর মাথায় ভূত চাপে তাঁকে মাইক্রোসফট সার্টিফায়েড সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে। কিন্তু তখন তাঁর সামর্থ্য ছিলনা কোথাও এ বিষয়ে কোর্স করার। কিংবা কোনো সময় বের করে পড়াশুনা করার। তিনি মিরপুর থেকে বাসে চড়ে সেগুনবাগিচা যেতেন অফিসে। ফিরতে ফিরতে রাত নটা। যেতে এবং আসতে যে সময়টুকু বাসে বসে থাকতে হতো সেসময় তাঁর হাতে থাকত কম্পিউটারের বই। এভাবে বাসে বসে পড়াশুনা করে আটটি পরীক্ষা দিয়েছিলেন তিনি। এবং যথারীতি মাইক্রোসফটের পরীক্ষায় পাশ করেছেন। এটি অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে।

এবার বলি আমাদের দেশের এক প্রখ্যাত ব্যক্তির কথা। আইন সম্পর্কে পড়াশুনা করেছেন কিংবা আইন সম্পর্কে আগ্রহ আছে এমন কাউকে পাওয়া যাবে না যে গাজী শামসুর রহমানের নাম শোনেনি। একসময় বিটিভিতে আইন-আদালত অনুষ্ঠানে তাঁর আলোচনা অনেকেই শুনেছেন। দবির ও কবিরের গল্প দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিতেন আইনের বিধান। মৃত্যুর কিছুদিন আগে প্রকাশিত তাঁর এক সাক্ষাতকারে জানতে পারি তাঁর সম্পর্কে এক বিচিত্র তথ্য। তিনি প্রচুর পড়াশুনা করতেন। আর এই পড়াশুনার জন্য প্রতিদিন সময় বের করার দরকার হতো না। তাঁর বেশিরভাগ পড়াশুনা হতো টয়লেটে। বাথরুমকে বানিয়েছিলেন একটি ছোটখাটো লাইব্রেরি। কমোডে বসেই চলত পড়াশুনা। যাঁরা একদমই সময় পাননা তাঁরা এই সময়টি ব্যবহার করতে পারেন। কারণ এই সময়টুকু একান্তই আপনার! কেউ আপনাকে বিরক্ত করবে না।

তাহলে আর দেরি কেন? শুরু করুন আপনার প্রকল্প। কী করতে চান আপনি? শেষ করতে চান রবীন্দ্র রচনাবলী? নাকি জানতে চান দর্শনের ইতিহাস, বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি? শুরু করে দিন পড়াশুনা কিংবা লেখালেখি। যাঁরা লেখার ইচ্ছে পোষণ করতে চান তাদের জন্য এই এক ঘণ্টাই হতে পারে সাফল্যের চাবিকাঠি। প্রতিদিন এক ঘণ্টা ব্যয় করে আপনি হতে পারেন আইন বিশেষজ্ঞ, হতে পারেন লেখক-নাট্যকার, কিংবা আরো অনেক কিছু!

Leave a Reply

%d bloggers like this: