তবুও সূর্য ওঠে

বন্ধু আমার, তোমার উদ্দেশ্যে লিখছি, দূর থেকে। ভাসমান অবস্থায়। সত্যিকার অর্থেই ভাসছি অথৈ সাগরে, যেভাবেই চিন্তা করো না কেন। আমার এই ভাসমান জীবনে কেউ জানতে চায়নি কেমন আছি। কেউ চায় না। সবাই চায় নিজে ভাল থাকতে। তুমি তাদের মতো নও। তুমি যে তা নও বুঝেছি অনেক আগেই; তোমার সঙ্গে পরিচয়ের মুহূর্তে।

তোমার সঙ্গে পরিচয় কোনো এক সন্ধ্যায়, কবিতার আসরে। তুমি কবিতা ভালবাসতে। আরো ভালবাসতে সংগঠন। সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংগঠনে তোমার প্রচুর আগ্রহ। সংগঠক হিসেবে তুমি ছিলে সফল। সেই সন্ধ্যায়, এবং তারপর সেটা বেশ ভালভাবেই বুঝেছি।

তুমি মানুষের মঙ্গল চাইতে, এখনও চাও। তোমার দু’চোখে স্বপ্ন মানুষের মুক্তির। এই জীর্ন সমাজ ব্যবস্থায় তোমার আস্থা নেই। এতে ভাল থাকা যায় না, কেউ ভাল থাকতে পারে না; এটা তুমি জানতে। জানতে বলেই প্রচন্ড আগ্রহ ছিল এই সমাজকে বদলানোর। বিপ্লবের স্বপ্ন দেখতে তুমি। এবং দেখাতে। বোঝাতে মেহনতির মুক্তির পথটা কী।

এবং তোমার কাছেই আমার রাজনীতির হাতেখড়ি। তুমিই বুঝিয়েছিলে মার্কসীয় তত্ত্ব। মার্কসের নাম শুনেছিলাম, কিন্তু তার সঙ্গে পরিচয় ছিল না। তুমি হাত ধরে পরিচয় করে দিলে মার্কসের সাথে, লেনিনের সাথে। তুমিই পড়ালে মার্কসীয় সাহিত্য, তোমার নিজস্ব সংগ্রহ থেকে। নীহার কুমার সরকারের ছোটদের অর্থনীতি, ছোটদের রাজনীতি আর অনিল মুখার্জির সাম্যবাদের ভূমিকা পড়িয়েছ বিশেষ আগ্রহ নিয়ে। তারপর অনেক পরে পড়িয়েছ মার্কসের রচনা, লেনিনের রচনা। পরিচয় করিয়ে দিয়েছ এঙ্গেলসের এন্টিড্যুরিং এর সাথে।

শুধু রাজনীতি নয়, সাহিত্যের সঙ্গেও ছিল তোমার সখ্য। সেই সম্পর্কের সূত্র ধরেই আমাকে নিয়ে গেছ সাহিত্যের রাজ্যে। চিরায়ত আর সমসাময়িক উভয়দিকেই তোমার বিচরণ। ভুলি কি করে যে তোমার কাছেই শিখেছিলাম সাহিত্যের ভাল-মন্দ বিচার করতে।

তারপর কেটে গেছে অনেক সময়। তোমার সঙ্গে আমি যুক্ত হয়ে গেছি, কর্মে-চিন্তায়। কত না ঘুরেছি এক সাথে। তুমি ঘুরেছ সংগঠনের জন্য, সাথে আমিও। মানুষের কাছে যেতে তুমি। আঙুল তুলে দেখাতে মানুষের দুর্দশার চিত্র। এবং সেইসব দিনগুলো আমাদের জীবনে স্মরণীয় অবশ্যই।

আমাদের আরো এক বন্ধু ছিলেন, তিনি আমাদের শিক্ষক। তোমার মাধ্যমেই তাঁর সান্নিধ্যে আসা। তাঁর সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলাপ হয়েছে সাহিত্য নিয়ে, কবিতা নিয়ে, রাজনীতি নিয়ে। এবং সেইসব আলোচনা সমৃদ্ধ করেছে আমাদের ভান্ডার।

মনে পড়ে একদিন- তুমি আর আমি গেলাম তাঁর কাছে; তিনি নিজের সম্পাদিত একটি পত্রিকা তুলে দিলেন আমার হাতে। তাতে নিজ হাতে লিখে দিলেন: বেঁচে থাকো সাহিত্যের সুবাতাসে। হ্যাঁ, তিনি সাহিত্য ভালবাসতেন। এবং বিশ্বাস করতেন সত্যিকার সাহিত্য পাঠ আমাদের মানবিক বৃত্তিগুলোকে শাণিত করে। আবুল ফজলের মতো তিনিও বিশ্বাস করতেন, সত্যিকার সাহিত্য পাঠে হিন্দু আর হিন্দু থাকে না, মুসলমান মুসলমান থাকে না – মানুষ হয়ে ওঠে। ওই মানুষ হয়ে ওঠাই ছিল তোমার লক্ষ্য।

তুমি রাজনীতি করতে। কিন্তু রাজনীতির চেয়েও তোমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সংস্কৃতির চর্চা। সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দিতে তুমি। মার্কসবাদী বলেই হয়ত এটা সম্ভব হয়েছিল। অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে লড়াই শুধু শ্লোগান দিয়ে হবে না। চাই সুষ্ঠু সংস্কৃতির ধারা গড়ে তোলা। এটা তুমি বুঝতে বলেই সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তোলায় তোমার প্রচুর আগ্রহ ছিল। করেছিলেও।

সবাই বিপ্লবী হইনি, তবু আমরা গর্ব করতে পারি যে, তোমার সেই সংগঠনে আমরা যারা ছিলাম তারা কেউই বখে যাইনি। যেমন আজকাল কাজ না পেয়ে তরুণরা হারিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে। এক গভীর অন্ধকারের দিকে তাদের যাত্রা। তাদের ক্ষেত্রে দেখি মেধা-রুচি-সংস্কৃতির অধোগামিতা প্রকট হিন্দি ছবির নায়িকাদের শরীর সর্বস্ব নাম আর উদ্ভট কথা ও সুরের গানকেই ভাবছে সংস্কৃতি হিসেবে। সংস্কৃতির তাৎপর্য তাদের বোধগম্য নয়।

অপসংস্কৃতির জোয়ার বেড়েছে বৈ কমেনি। এটা তোমার অভিমত। এর কারণ পুঁজিবাদী, সাম্রাজ্যবাদী চক্র। যারা তরুণ ও যুব সমাজকে ক্রমাগত আকৃষ্ট করছে বুর্জোয়া সংস্কৃতিহীনতার দিকে। তরুণ সমাজকে কতটা আদর্শবিমুখ, পরিশ্রম বিমুখ, ইন্দ্রিয়পরায়ণ ও ভোগসর্বস্ব করে তোলা যায় সেটাই তাদের লক্ষ্য।

কেউ এসব নিয়ে ভাবছে না, কেউ কোনো উচ্চবাচ্য করছে না। চারদিকে এক অদ্ভূত নীরবতা। বুদ্ধিজীবিরা পথ দেখাবেন বলে তোমার আশা ছিল। কিন্তু তারা তা করছেন না। আপন স্বার্থ রক্ষায় তারা ব্যস্ত। কেউ কেউ পথ দেখানোর নামে জনগণকে নিয়ে যাচ্ছেন ভুল পথে। তোমার তাই আস্থা নেই বুদ্ধিজীবিদের উপর। বিশেষ করে যখন তারা গণবিচ্ছিন্ন হন, তখন। না, অন্য কেউ পথ দেখাবে না।

আমাদের পথ আমাদেরকেই দেখে নিতে হবে। আমরাই হবো আমাদের পথপ্রদর্শক। সেই পথ দেখে নেবার চেষ্টায় তুমি এখন লিপ্ত।

বন্ধু মনে পড়ে, কয়েক বছর আগে সোভিয়েত যখন ভাঙছে; তখনকার কথা। চারদিকে হৈ হৈ রব। পুঁজিবাদীরা গলা ফাটাচ্ছে। সমাজতন্ত্রের পতন ঘটছে – ভেঙে ফেলা হচ্ছে লেনিনের মূর্তি, মুছে ফেলা হচ্ছে মার্কসের কর্ম। এমনি এক সময়ে তুমি-আমি, এক সন্ধ্যায়, নির্জনে বসেছিলাম। তোমাকে বিষন্ন দেখাচ্ছিল। কথা উঠেছিল সোভিয়েতের এই করুণ পরিণতি নিয়ে। তুমি বলেছিলে, ওটাই স্বাভাবিক ছিল। কারণ সেই পতন একদিনে হয়নি; শুরু হয়েছে অনেক আগেই।

সোভিয়েতের পতন মানেই সমাজতন্ত্রের পতন নয়, এটা তুমি জানতে। তবু তুমি কষ্ট পেয়েছ এই ভেবে যে মহামতি লেনিনের প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থখা ভেঙে পড়ল কতিপয় কুলাঙ্গারের হাতে পড়ে। সোভিয়েতের পতনের পর মানবিকতার শত্রু আমেরিকা হবে একমাত্র মোড়ল এবং পুঁজিবাদীরা বিস্তার করবে তাদের সাম্রাজ্য। এই ভেবে তুমি শঙ্কিত হয়েছিলে। আরো বেশি দু:খ পেয়েছিলে এদেশীয় রাজনীতিকদের বালখিল্যতা দেখে।

বুদ্ধিজীবিদের অনেকেই ছদ্মাবরণ ছেড়ে বেরিয়ে আসছিলেন তখন, রাজনীতিকদের অনেকেই ডিগবাজি দিয়ে চলে যাচ্ছিলেন অপর সীমানায়। সেটা বেশ হাস্যকর ছিল; এবং তুমি বেশ কৌতুক নিয়েই উপভোগ করেছ।

তাদেরই কেউ কেউ আজও সমানে বিষোদগারণ করছে, সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে। তাদেরকে তুমি ততটা ডরাও না, যতটা ডরাও ঘাপটি মেরে থাকা ছদ্মবেশি সমাজতন্ত্রীদের। এই ছদ্মবেশী সমাজতন্ত্রীরাই ক্ষতি করেছে বাম রাজনীতির, অতীতে যেমন করেছে তেমনি করবে ভবিষ্যতে। এ বিষয়ে বেশ সতর্ক থাকার পক্ষপাতী তুমি।

অনেকেই শখ করে মার্কসবাদী হয়। সম্পূর্ণ বুর্জোয়া চিন্তা-চেতনাকে ধারণ করে বিশিষ্ট মার্কসবাদী সাজে। পত্রিকায় প্রবন্ধ লেখে আর সভা-সেমিনারে গলা ফাটায় মার্কসের নামে। জনগণের কাছাকাছি যেতে চায় না কখনো। ওইসব শৌখিন মার্কসবাদীদের বিষয়েও সতর্ক থাকার পরামর্শ ছিল তোমার।

বন্ধু তুমি তো কবিতা লিখতে। বিপ্লবীরাও কবিতা লেখে, কবি হয় কেউ কেউ। তুমি কবি হও নি। তারও এক কারণ আছে। সেই ঘটনাটা অবশ্যই ভুলবার নয়। কবিখ্যাতির শখ ছিল না তোমার, তবু একটা কবিতা পাঠিয়েছিলে বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিকে, স্বনামে। তারপর কয়েকমাস অপেক্ষা করলে। বোঝা গেল অমনোনীত হয়েছে। তারপর একদিন সেটি পাঠালে ছদ্মনামে; সুন্দর একটা নাম নিলে, মহিলার নাম। অল্পদিনের মধ্যেই সেটি প্রকাশিত হলো। সাহিত্যগুণে নয়, কবিতা প্রকাশিত হয় নাম দেখে – বিশেষ করে সেটি যদি হয় নারীর নাম!

বন্ধু, অনেকদিন পর তোমার চিঠি পেলাম। পড়ে মনে হলো হতাশা তোমাকে গ্রাস করছে। নব্বুইঢের আন্দোলনে যে উচ্ছল তরুণকে দেখেছিলাম, সে হারিয়ে গেছে। একাত্তরে যাদের কবর দিয়েছি ভেবেছিলাম তাদের হিংস্র উত্থান দেখে তুমি শঙ্কিত। অন্ধকারের জীবেরা গর্ত থেকে বেরিয়ে আসছে সদলবলে। সমাজ-রাষ্ট্র-সভ্যতা সবকিছুকে ঠেলে দিতে চায় তাদের সেই অন্ধকার গুহায়।

বন্ধু, হতাশার কিছু নেই। তোমাকে লিখতে ভোর হয়ে আসে। ওই দেখ চারদিকে মানুষ আবারও জেগে উঠছে। নতুন দিনের সূর্যের মতোই উজ্জ্বল তারা। তারা মুক্ত করতে চায় নিজেকে; বিশ্বকে করে যেতে চায় সবার বাসযোগ্য। তোমার মতো তরুণদের একান্ত প্রয়োজন তাদের ওই সংগ্রামে। এই কুজ্ঝটিকা সাময়িক মাত্র।

অন্ধকারের বুক চিরে লাল সূর্য তো উঠবেই; ভয় কি বন্ধু? #

বাংলার আশা জাহাজে বসে লেখা।

সাপ্তাহিক সময় । ২ বর্ষ / ১৩ সংখ্যা / ৪ নভেম্বর ১৯৯৪ -এ প্রকাশিত

Series Navigationবড় হওয়ার সহজ উপায় >>

Leave a Reply

%d bloggers like this: