তোমার তুলনা তুমি

প্রতিটি মানুষ অনন্য; পৃথিবীতে কোনো একটি মানুষ আরেকটি মানুষের মতো হুবহু এক নয় – চেহারা, গুণ, বুদ্ধিমত্তা সব মিলিয়ে। মানুষের এই অনন্যতা যখন স্বীকার করে নিতে পারবেন এবং প্রতিটি অনন্য মানুষকে শ্রদ্ধা করতে পারবেন তখন আপনি নিজেই এক অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করবেন। নিজের ক্ষেত্রে এটি আরো সত্য। নিজের অনন্যতাকে স্বীকার করে নিয়ে নিজের উপর সন্তুষ্ট হতে পারেন। আমি কেন অমুকের মতো নই – স্রষ্টা কেন আমাকে তার মতো বানালো না, এরকম চিন্তা তখন আপনাকে বিব্রত করতে পারবে না।

কাজের ক্ষেত্রেও তেমনি। আমরা বিভিন্নজন বিভিন্ন পেশায় আছি, পদে আছি। কারো উপার্জন বেশি, কারো কম। তবে প্রত্যেক পেশা কিছু না কিছু করে – তার প্রয়োজন আছে; যে জুতা সেলাই করে সে যেমন সমাজের সেবা করে যাচ্ছে, তেমনি সেবা করে যাচ্ছে যে শিক্ষকতা করছে কিংবা ব্যাঙ্কিং করছে কিংবা ব্যবসা করছে। কিন্তু আমাদের অনেকের মধ্যেই প্রবণতা হলো অন্যের সাথে নিজেকে তুলনা করা। পন্ডিতমশাই গল্পের কথা মনে আছে নিশ্চয়। পন্ডিতমশাই এক মহৎ পেশায় নিয়োজিত; তার কাজ শিক্ষা দান করা –  সৈয়দ মুজতবা আলী – কিংবা এরকম আরো অনেক মানুষ তৈরি করা। কিন্তু পন্ডিতমশাই নিজেকে তুলনা করলেন কিসের সাথে? বিদেশি সাহেবের কুকুরের ঠ্যাঙের সাথে। নিজেকে নামিয়ে নিয়ে গেলেন এক মহৎ পেশা থেকে এক নিম্নমানের প্রাণীর প্রত্যঙ্গের পর্যায়ে।

এরকম আমরা প্রায়ই করে থাকি। সেদিন একজন এরকম নিজেকে তুলনা করছেন এক বিরিয়ানী ব্যবসায়ীর সাথে। বিরিয়ানী ব্যবসায়ীর দুই হাঁড়ি বিরিয়ানীর সমান তার মাসিক বেতন – নিজেকে কোনো ক্রমেই সেই দুই হাঁড়ি বিরিয়ানীর বেশি ভাবতে পারছেন না। কিন্তু তিনি কাজ করেন এক বড় সংস্থায়, দায়িত্বশীল পদে। বিরিয়ানীর সাথে নিজের মূল্যমান নির্ধারণ করে বেচারা বেশ অসুখী; নিজেকে প্রায়ই তুচ্ছ ভাবছেন। কিন্তু চিন্তাটা একটু ভিন্নভাবে করলেই নিজেকে নিয়ে গর্ববোধ করতে পারতেন। যে মহৎ কর্মের সাথে তিনি জড়িত সেটি নিয়ে তার বুক ফুলে ওঠার কথা।

দূরবীক্ষণ যন্ত্র দেখার সুযোগ আপনাদের অনেকেরই হয়ে থাকবে। বড় দূরবীক্ষণ না হলেও চলবে – খেলনা যেসব দূরবীক্ষণ যন্ত্র দেখা যায় সেগুলিই একটি হাতে নিন। স্বাভাবিকভাবে ছোট লেন্সের দিকে চোখ রাখতে হয়; বড় লেন্সের দিকটা বাইরের দিকে থাকে। আপনি এর ফলে দূরের জিনিসটা কাছে দেখতে পান। এখন ঠিক উল্টো করে ধরুন; বড় লেন্সের দিকটা চোখে লাগান – ছোটো লেন্সের দিকটা বাইরে থাকুক। এবার দেখবেন কাছের জিনিসও অনেক দূরে সরে গেছে। আমাদের চিন্তার ক্ষেত্রেও তেমনটি ঘটে থাকে। আমরা লেন্স বদলিয়ে ফেলি; যেটি নিয়ে গর্ববোধ করার কথা সেটি নিয়ে দু:খ করি; সুখের বিষয়কে কষ্টে পরিণত করি। নিজের যা আছে সেটিকে ভালভাবে না দেখে, সেটির জন্য শোকরিয়া প্রকাশ না করে অন্যের কি আছে তার দিকে তাকাই। আর অন্যের যা দেখি তাতেই ঈর্ষাবোধ করতে থাকি – নিজের বাড়ির চেয়ে অন্যের বাড়ি, নিজের গাড়ির চেয়ে অন্যের গাড়ি ভাল লাগে; নিজের স্ত্রীর চেয়ে অন্যের স্ত্রীকে আকর্ষণীয়া মনে হয়; নিজের স্বামীর চেয়ে অন্যের স্বামীকে কর্মঠ ও সফল মনে হয়; অন্যের সন্তানের সাথে নিজের সন্তানের তুলনা করি আর ভাবি এরা সব গাধার বাচ্চা। এসব মনে করে আফসোস করি। আসলে নদীর এক পাড় সবসময় অন্য পাড়ের দিকে তাকিয়ে আফসোস করেই চলেছে। যে পাড়ে আছেন সেখানে শান্তি না পেলে অন্য পাড়েও শান্তি পাবেন না। বাঙালি কবি বলেছিলেন, ‘পরের দুখের কথা করিলে চিন্তন, নিজের দুখের কষ্ট রহে কতক্ষণ।’ কথাটি বড়ই সত্য। তবে এর বিপরীতটা আরো সত্য: ‘পরের সুখের কথা করিলে চিন্তন নিজের সুখ রহে কতক্ষণ।’ এটি বিশেষ করে সত্য আমাদের মতো পরশ্রীকাতর বাঙালির জন্য।

এই পরশ্রীকাতরতা থেকে বাঁচার উপায় হলো নিজের দিকে তাকানো; নিজের যা আছে তার মূল্যায়ণ করা – তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। যখন নিজের দিকে ভালভাবে তাকাবেন, নিজের গুণের দিকে তাকাবেন – তখন নিজেই আশ্চর্য হবেন। আপনার যা আছে তা আর কারো নেই। মানুষ প্রেমে পড়লে প্রেমিকাকে এরকম অনন্যা মনে হয়, তার বদলে অন্য কাউকে ভাবাই যায় না। কিন্তু সে নিজেও যে অনন্য সেই বোধ তার মধ্যে আসে না। তাই নিজের প্রেমে পড়ুন – নিজের অনন্যত্বকে উপলব্ধি করতে পারবেন; যখন নিজের অনন্যত্বকে উপলব্ধি করতে পারবেন এবং নিজের উপর পুরো আস্থা রাখতে পারবেন তখন আপনি হয়ে উঠবেন অপ্রতিরোধ্য। আর যখনই অন্যের সাথে নিজের তুলনা করতে যাবেন তখন আপনি নিজেকে নামিয়ে আনবেন তুলনাযোগ্যর পর্যায়ে; নিজেকে কুকুরের ঠ্যাঙ কিংবা বিরিয়ানী ভাবতে প্রলুব্ধ হবেন এবং সেটি নিয়ে দু:খ প্রকাশ করতে থাকবেন, বিলাপ করতে থাকবেন। এই বিলাপ বন্ধ করতে চাইলে নিজের দিকে তাকান, নিজেকে ভালবাসুন, নিজের উপর আস্থা রাখুন এবং অন্যের সাথে নিজের তুলনা বন্ধ করুন।

১৪.০৫.২০১৬ / কফিওয়ার্ল্ড, ধানমন্ডি


Also published on Medium.

Leave a Reply

%d bloggers like this: