ধনী হওয়ার অধিকার

অনেকেই দারিদ্রের প্রশংসা করেন। আমাদের বাঙালি কবি কাজী নজরুল ইসলামও এর প্রশংসা করতে ছাড়েননি। কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘হে দারিদ্র তুমি মোরে করেছ মহান, তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রিস্টের সম্মান।’ আজকের দিনে তিনি বেঁচে থাকলে কী বলতেন জানি না। আজ হয়ত বুঝতে পারতেন দরিদ্র হয়ে খ্রিস্টের সম্মান পাওয়ার চেয়ে বিল গেটস হয়ে গালি খাওয়া অনেক ভাল।

দারিদ্রের যতই প্রশংসা করা হোক না কেন এটি প্রায় সবাই স্বীকার করবেন যে সুখ সাচ্ছন্দ্যের জন্য, ভালভাবে বেঁচে থাকার জন্য দারিদ্র একটি বাধা। সফল কিংবা পূর্ণাঙ্গ জীবনের স্বাদ পেতে হলে দারিদ্রের পূজা করে চলবে না, পূজা করতে হবে প্রাচুর্যের। আমাদের আত্মার বিকাশ চাইলে আগে নিজেকে মুক্ত করতে হবে দারিদ্রের বেড়াজাল থেকে। দারিদ্র আমাদেরকে পরমুখাপেক্ষী করে রাখে। আমাদের আত্মাকে করে রাখে হীন, দৃষ্টিভঙ্গিকে করে ফেলে সঙ্কীর্ণ। আমাদের বেঁচে থাকার জন্য যে খাবার দরকার সেটির জন্যও দারিদ্র সহায়ক নয়, চাই টাকা, চাই বিত্ত। আপনি যত বিত্তবান হবেন ততই আপনার স্বাধীনতা বিস্তৃত হবে। আপনি সাহিত্যের চর্চা করতে চান, শিল্পের প্রশংসা করতে চান, সঙ্গীতের রস আস্বাদন করতে চান, কিংবা মেঠোপথে ঘুরে জীবনকে উপভোগ করতে চান – এসবের জন্য আগে চাই দারিদ্র থেকে মুক্তি।

আমাদের শরীরকে, মনকে, আত্মাকে বিকশিত করার জন্য এ জীবনে অনেক জিনিসের দরকার হয়। আপনি জ্ঞানার্জন করতে চান – এর জন্য চাই অর্থ। আপনি কাব্য চর্চা করতে চান? এর জন্য চাই অন্নসংস্থান। আমাদের সমাজ এমনি যে জীবনের এসব মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য আমাদের নির্ভর করতে হয় অর্থের উপর। খাবার কিনতে গেলে অর্থ লাগে, বাস করতে গেলে অর্থ লাগে, সৌন্দর্য উপভোগ করতে গেলে অর্থ লাগে, জ্ঞানার্জন করতে গেলে অর্থ লাগে, নিজের চিন্তাকে প্রচার করতে চাইলে অর্থ লাগে। আর এসব অর্থ উপার্জনের জন্য আপনাকে অবশ্যই সচেষ্ট হতে হবে। আপনার বিকাশের জন্যই ধনী হতে হবে। আর এজন্যই ধনী হওয়ার নিয়মকানুন জানতে হবে।

আপনার বেঁচে থাকার অধিকার আছে। সৃষ্টিকর্তা আপনাকে তৈরি করেছেন বেঁচে থাকার জন্য। একটি জীবন অতিবাহিত করার জন্য। বেঁচে থাকা মানে যেনতেনভাবে জীবন অতিবাহিত করা নয়, বেঁচে থাকা মানে মানুষের মতো সম্মানের সহিত মাথা উঁচু করে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকা। জীবনকে পাশ কাটানো নয়, জীবনের প্রতিটি মুহুর্ত উপভোগ করা, প্রতিটি মুহূর্তকে নিজের ও অন্যের কল্যাণে লাগানো। আর এসব করতে হলে আপনাকে যথেষ্ট বিত্তের মালিক হতে হবে। মানসিক পরাধীনতা থেকে বাঁচতে হলে আগে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা লাভ করতে হবে। অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হতে পারলে তখন নিজের ইচ্ছের বিরূদ্ধে কিছু আপনাকে করতে হবে না। যা করবেন আপনার পছন্দমতো, অবশ্যই নৈতিকতার মধ্য থেকে।

বেঁচে থাকার জন্য যা প্রয়োজনীয় তার সবকিছু যার আছে সেই ধনী; আর যার পর্যাপ্ত টাকা নেই তার পক্ষে সব প্রয়োজন মেটানো সম্ভব নয়। আমাদের জীবন এতটাই অগ্রসর হয়েছে, আর এতটাই জটিল হয়ে পড়েছে যে যথেষ্ট অর্থ না থাকলে সন্তোষজনকভাবে বেঁচে থাকা যায় না। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ মেধার বিকাশ চাই, প্রতিভার বাস্তবায়ন চাই। কেউ যদি মনে করে তার গানের গলাটা চমৎকার,তাহলে সে অবশ্যই চাইবে সঙ্গীতের চর্চা চালিয়ে যেতে। কেউ যদি তার কাব্যপ্রতিভায় বিশ্বাস করে তাহলে সে চাইবে সব কাজ রেখে কাব্য সাধনা করতে। তেমনি কেউ ক্রীড়ায়,কেউ শিল্পে নিজেকে নিয়োজিত করতে চাইবেন। এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু সবাই এটি করতে পারেন না। কারণ প্রধান বাধা হলো আর্থিক অস্বাচ্ছল্য। এভাবে আমরা আমাদের বিকাশকে রুদ্ধ করতে বাধ্য হই দারিদ্রের কারণে, কিংবা বলতে পারেন বিত্তের অভাবে। সাফল্য হলো সেটিই যখন আপনি যা হতে চান তা হতে পারেন। আপনি ডাক্তার হতে চান- কিন্তু আর্থিক দৈন্যের কারণে হতে পারলেন না – দারিদ্র আপনাকে সফল হতে দিল না। আপনি ঠিকই ডাক্তার হতে পারতেন যদি আর্থিক স্বাচ্ছল্য থাকত। আপনি গবেষণা করতে চান, কিন্তু পারছেন না – কারণ অন্ন সংস্থানের জন্য প্রতিদিন আপনাকে ব্যতিব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। এর সবই করা সম্ভব হতো যদি আপনি বিত্তবান হতেন। আর তাই সব জ্ঞানার্জনের আগে জানা দরকার কীভাবে বিত্ত অর্জন করা যায়। এই জ্ঞান থাকলে অন্য সকল জ্ঞান অর্জন করা আপনার জন্য সহজ হয়ে যাবে।

বিত্তবান হওয়ার মধ্যে কোনো দোষ নেই। দোষ নেই যদি আপনি তা বৈধ পথে অর্জন করেন। আপনি যদি অন্যের ক্ষতি না করে ধনী হন তাতে কারো কিছু বলার নেই। যদিও আমাদের সমাজ ধনী হওয়াকে অন্য চোখে দেখে। দরিদ্র কেউ বিত্তবান হয়ে গেলে অনেকেই সেটিকে সহ্য করতে পারে না। অনেকেই বাঁকা চোখে দেখে। আর এ ভয়েই অনেকে ভাবে – কাজ নেই ধনী হয়ে, যেমন আছি তেমনি থাকতে চাই। চাই না বিত্তবান হয়ে ‘নষ্ট’ হতে। আমাদেরকে অবশ্যই এই ভ্রান্ত ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বুঝতে হবে যে ধনী হওয়া দোষের কিছু না, বরং গুণের। মানুষের প্রকৃত মঙ্গল করতে চাইলে বিত্তের মাধ্যমেই করতে পারেন, দারিদ্র দিয়ে নয়। বিশাল হৃদয় আর শূণ্য পকেট নিয়ে আপনি কারো মঙ্গলেই লাগবেন না!

যে ব্যক্তি প্রাচুর্যের পরিবর্তে দারিদ্র চায়, সে আসলে অপ্রকৃতিস্থ। কারণ প্রাচুর্যই স্বাভাবিক। স্রষ্টার এ জগতে প্রাচুর্যের কোনো অভাব নেই। স্রষ্টার এই সৃষ্টিকে দূরে সরিয়ে কেউ যদি দারিদ্রকে বেছে নিতে চায় তাহলে সে আসলে স্রষ্টাকে দূরে ঠেলে দেয়। তাই যে ব্যক্তি তার প্রয়োজন মেটানোর জন্য, তার আকাঙ্ক্ষা মেটানোর জন্য অর্থ উপার্জন করতে চায় না সে অপ্রকৃতিস্থ।

মূলত তিনটি উদ্দেশ্যে আমরা বেঁচে থাকি: আমাদের শরীরের জন্য, আমাদের মনের জন্য, আমাদের আত্মার জন্য। এগুলির কোনো একটি আরেকটির চেয়ে পবিত্র কিংবা উৎকৃষ্ট নয়। সবকটিই সমান, একটিকে ছাড়া অন্যটি অর্থহীন। তাই আমরা চাইব সমানভাবে সবগুলিকে বিকশিত করতে। কোনো একটির অবহেলা অন্যগুলিকে ভাল থাকতে দেয় না। আপনার শরীর যদি খাদ্যাভাবে ভোগে তাহলে মন ঠিক থাকবে না। মন ঠিক না থাকলে আত্মিক বিকাশও রুদ্ধ হবে। তাই মন কিংবা শরীরকে অবহেলা করে কেবল আত্মার জন্য বেঁচে থাকা ঠিক হবে না; তেমনি কেবল বুদ্ধির বিকাশ ঘটিয়ে শরীর কিংবা আত্মাকে অবহেলা করাও ঠিক হবে না।

মন ও আত্মাকে বাদ দিয়ে কেবল এই শরীরের জন্য বেঁচে থাকার ফল আমরা জানি। আমরা যখন হতদরিদ্র থাকি তখন কেবল এই শরীরের খাদ্য জোগাতেই ব্যস্ত থাকি – মন কিংবা আত্মার দিকে নজর দেয়ার ফুরসত পাই না। তাই একসময় আমরা হৃদয়হীন কিংবা অমানুষ হিসেবে আবির্ভূত হই। সেই মানুষই পূর্ণাঙ্গ যার দেহ, মন ও আত্মা সমানভাবে বিকশিত। আর এই তিনটির সুসম বিকাশের জন্যই প্রাচুর্য দরকার।

বেঁচে থাকার প্রথম শর্ত হলো আমাদের দেহের চাহিদা মেটানো। দেহ চায় খাদ্য, আরামদায়ক পোশাক, আরামদায়ক বাসস্থান, এবং অত্যধিক পরিশ্রম থেকে মুক্তি। এই দেহের জন্য বিশ্রাম এবং বিনোদনও দরকার হয়।

আমাদের মনকে সতেজ রাখার জন্য দরকার মনের চাহিদা পূরণ করা। আপনার মন চাইতে পারে কোনো ভাল বই পড়তে, চাইতে পারে কিছু জানতে। শুধু বই পেলেই হবে না, মনের চাহিদা পূরণ করতে হলে সেই বই পড়ার সময়ও বের করতে হবে। মন চাইবে বেড়াতে, এ বিশ্বকে দেখতে, প্রকৃতিকে উপভোগ করতে। মনের বিকাশের জন্য আমাদের আরো দরকার বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ, সৌন্দর্যের অনুধাবন, শিল্পকলা, কবিতা, নাটক, সাহিত্য ও আরো অনেক সৃজনশীল মাধ্যম। এসবই আমাদের দরকার হবে মনের খাদ্য যোগানোর জন্য।

আত্মার প্রয়োজন ভালবাসা। আর এই ভালবাসা দুর্লভ যদি আপনি দারিদ্রের মাঝে বাস করেন: অন্যরা ভালবাসে না, নিজেও ভালবাসার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। ভালবাসার বড় প্রকাশ অন্যকে দেয়ার মাধ্যমে। যার কিছু দেয়ার নেই সে কীভাবে অন্যকে ভালবাসবে? যার কিছুই দেয়ার নেই সে তাই স্বামী, পিতা কিংবা নাগরিক হিসেবে তার যথার্থ দায়িত্ব পালন করতে পারে না। অনেকেই হয়ত বলবেন ভালবাসা কী বস্তু দিয়ে মাপা যায়? অবশ্যই। নাটকে সিনেমায় না হলেও ভালবাসার আসল প্রকাশ আগে বস্তুগত চাহিদা মেটানোতে, তারপর অন্য চাহিদা। সেই কথাটিও স্মরণে রাখা দরকার, অভাব যখন দরজায় আসে, ভালবাসা তখন জানালা দিয়ে পালায়।

এতক্ষণে নিশ্চয় বুঝে গেছেন বিত্ত কেন দরকার, আপনাকে কেন ধনী হতে হবে, কেন ধন উপার্জন করতে হবে। আপনার পূর্ণাঙ্গ বিকাশের জন্য এটি করতে হবে। যখন আপনি দেহের চাহিদা মিটিয়ে মনের ও আত্মার চাহিদাও মেটাতে পারবেন তখনই আপনি যথার্থ সফল। এই সাফল্যের জন্যই ধন চাই, উপার্জন চাই। আর এটি কীভাবে পাবেন সেটি জানতে হবে বিত্ত উপার্জনের কিছু নিয়ম জেনে, এবং সেসব বাস্তবে প্রয়োগ করে। বিত্ত উপার্জনের অধিকার আপনার জন্মগত, এবং আর দশজনের মতো আপনিও এটি করতে পারবেন – আপনি চাইলেই।

আরো পড়ুন ধনী হওয়ার বিজ্ঞান নামের বইয়ে

Series Navigationধনী হওয়ার আছে যে নিয়ম >>

Leave a Reply

%d bloggers like this: