না বলুন অপ্রয়োজনীয় সবকিছুকে

জীবনের কঠিনতম কাজগুলোর একটি হলো ‘না’ বলা। অনেক কিছুতেই না বলা কঠিন, কারো দাওয়াতে, কারো অনুরোধে, আবার সবাই যা করছে তাকেও না বলা কঠিন। আবার কিছু আবেগ আছে যা আপনার যথেষ্ট সময় নষ্ট করে, আপনি সেটা বোঝেন, তারপরও না বলতে পারেন না। আপনি বোঝেন রাগ, উত্তেজনা, চিত্তবিক্ষেপ, ঘোর, কামনা এসব আপনার সময় নষ্ট করে। রেগে গেলে আপনি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না, ঠিকভাবে চিন্তা করতে পারেন না। আপনার নিজেরই অস্বস্তি হয়। কোনো কিছু নিয়ে অযথা উত্তেজিত হলেও কাজে মনোসংযোগ করতে পারেন না। আবার এমন অনেক কাজ আছে যেগুলি আপনাকে আচ্ছন্ন করে রাখে, ব্যস্ত করে রাখে, নেশার মতো সেটাইতে বুঁদ হয়ে থাকেন। এসব আপনার মনোসংযোগে বিঘ্ন ঘটায়, আপনি যা করতে চান অনেক সময়ই তা করতে দেয় না – তারপরও আপনি এসবকে না বলতে পারেন না। এমনিতে এসব তেমন বড় কিছু না, তারপরও এর প্রতি না বলা সম্ভব হয় না অনেকের।

ছোটখাটো বিষয়ে না বলতে পারার পরিণতি ভয়ানক হয়ে ওঠে। পিঁপড়া একটা ক্ষুদ্র প্রাণী। সেটা যখন আপনার গায়ে উঠছে তখনই বাধা না দিয়ে যদি এরকম আরো অনেক পিঁপড়াকে আপনার গায়ে উঠতে দেন তাহলে দেখা যাবে তাদের কামড়েই আপনি মরণাপন্ন হয়ে উঠেছেন। তেমনি ছোট ছোট কাজ, যা না করলেও চলে, যা আপনার জীবনে তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটাবে না – সেগুলিকে যদি না বলতে পারেন তাহলে আপনি সেসব ক্ষুদ্র কাজের মধ্যেই ডুবে থাকবেন, বড় কিছু করার সময় পাবেন না। বলা হয়ে থাকে, দুহাত পুঁটি মাছে বোঝাই থাকলে বড় কাতলা মাছ ধরা যাবে না। সেটা আপনার কাছে যতই ধরা দিতে চাক আপনার হাত খালি না থাকায় ধরতে পারবেন না। তাই স্টইক দার্শনিকরা বলেন, এরকম ছোট ছোট অগুরুত্বপূর্ণ কাজের প্রতি নির্মম হও। ঝেঁটিয়ে বিদেয় করো সেগুলিকে।

আপনি কি কল্পনা করতে পারেন ছোট ছোট কাজগুলো বাদ দিলে আপনি কী পরিমাণ সময় বাঁচাতে পারবেন? চেষ্টা করেই দেখুন না কেন। সামনে এরকম কিছু দেখলেই বলুন, ‘না, আমি এটাতে ডুবতে যাচ্ছি না।’ কেউ অনুরোধ করতে আসলে, সবিনয়ে বলুন, ‘না, আমি এখন এটা করতে পারছি না।’ কিংবা খুবই ভদ্রভাবে বলতে পারেন, ‘না, এখন আমার সময় নেই, পরে ভাবা যাবে।’ এভাবে যদি কিছু ঢেঁকি গেলা থেকে রেহাই পান তাহলে আপনার অযথা ব্যস্ততা কমবে, স্বাস্থ্যও ভালো থাকবে। শারীরিক, মানসিক উভয় স্বাস্থ্যই। হ্যাঁ, জানি- আপনার মুখে এরকম না শুনে প্রথমে অনেকেই নাখোশ হবেন। কিন্তু সেটা সাময়িক। আর আপনি যদি অনুরোধে ঢেঁকি গেলেন আর সেটি ঠিকমতো করতে না পারেন তাহলে অসুবিধাটা আরো প্রকট হবে। আপনি উপকার করতে গিয়ে তার বিরাগভাজন হবেন, অনেক ক্ষেত্রে আপনাকে তারা শত্রুর কাতারে নিয়ে গিয়ে ফেলবে। তাই নিজের সীমাবদ্ধতা আগেই স্বীকার করে নেয়া দরকার। কে মন খারাপ করবে সেটি দ্বারা প্রভাবিত না হয়েই নিজের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতেই নিতে হবে।

এভাবে যতই না বলতে শিখবেন ততই আপনার কাঙ্ক্ষিত কাজগুলো করার সময় বেশি পাবেন। আর এরকম কাজ করার জন্যই তো আপনার জীবন, তাই কি না? একটাই জীবন বাঁচার মতো বাঁচবেন, নিজের মতো বাঁচবেন। অন্যের জীবন আপনি কেন যাপন করবেন? স্টইক দার্শনিক সেনেকা’র লেখা একটা বিখ্যাত গ্রন্থ On The Shortness Of Life (জীবনের সংক্ষিপ্ততা প্রসঙ্গে)। তার মধ্যে সেনেকা বলছেন:

তোমার জীবনের কত কিছুই না হারিয়ে গেছে সে ব্যাপারে সজাগ না হওয়ার ফলে; অনর্থক খেদ, নির্বোধ আনন্দ, লোভী আকাঙ্ক্ষা আর সামাজিক পরিতুষ্টির ফলে – তোমার নিজের কতটুকু অবশিষ্ট ছিল তোমার মাঝে? তুমি শীঘ্রই বুঝবে যে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই মৃত্য ঘটতে যাচ্ছে তোমার।

সেনেকা, জীবনের সংক্ষিপ্ততা প্রসঙ্গে

সত্যিই তো তাই, আপনি যদি অন্যের অনুরোধে সবকিছু করতে থাকেন, আপনার নিজের উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ না থাকেন তাহলে সে জীবন আপনার না। তাই না বলতে শিখুন, নিজের মতো বাঁচুন।

Series Navigation<< নিয়ন্ত্রণআসক্তি >>

Leave a Reply

%d bloggers like this: