প্রথম শহর সিনেমা টিভি রিকশা

লেখকদের লেখা পড়ে আমরা মুগ্ধ হয়ে যাই, সেই মুগ্ধতা কাটতে চায় না। অনেকসময় সেই লেখকে দেবতার মতো ভক্তি শ্রদ্ধা শুরু করি। এখনকার দিনের ছেলেমেয়েদের কাছে এমন মনে হয় কি না জানি না, তবে আমাদের সময় হতো। আমাদের সময় বিনোদনের বড় মাধ্যম ছিল বই। কিছু করার নেই বই পড়ো, কিছু করার নেই বই দেখো, কিছু করার নেই বই নিয়ে আলোচনা করো। টিভি নামের বোকাবাক্স তখনও ঘরে ঘরে আঘাত করেনি; মোবাইল ফোন নামক মারণাস্ত্র অনেক দূরে। স্কুলে গিয়ে পড়াশোনার পর বাসায় ফেরা, বিকেলে মাঠে খেলাধূলা করা। তারপর বাসায় ফিরে আবার পড়তে বসা, খাওয়া, ঘুমানো। পুরোটা সময় পড়া নিয়ে ব্যস্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ তখন কোচিং ছিলো না, পড়াশোনার জন্য প্রাইভেট টিউটরও ছিল না।

তবে আমরা সন্ধ্যা বেলায় পড়তে বসতাম দল বেঁধে, ভাইবোন সবাই একসাথে। গরমকালে হলে উঠোনের মধ্যে, খোলা আকাশের নিচে। শীতের সময় হলে বারান্দায়। হারিকেনের মিটিমিটি আলোতে, কিংবা নিমতেলের প্রদীপের নিচে। আলো তখন অল্প ছিল, কিন্তু আগ্রহ ছিল প্রবল। সেই মিটিমিটি আলোতেই বইয়ের পাতার অক্ষরগুলো জীবন্ত হয়ে উঠত। একেকটি অক্ষর, একেকটি শব্দ, একেকটি বাক্য পড়তে পড়তে সেগুলির একটা রূপ দেখতে পেতাম চোখের সামনে। আমাদের কল্পনাই সেটি তৈরি করে দিত আমাদের সামনে।

ঢাকা শহরের কথা পড়তাম। ঢাকা অনেক বড় শহর। বাংলাদেশের রাজধানী। কেমন এই ঢাকা? আমার বাড়ির পাশে যে বাগানটাই সেটাকেই কল্পনা করতাম ঢাকা শহর হিসেবে। মা গল্প করতেন তার ঢাকা যাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা। সেখানে গিয়ে গিয়েছিলেন বাংলাদেশ বেতারের অফিসে। রেডিওর অনুষ্ঠান যারা করে তারা নাকি একটি কাচের ঘরে থাকে, বাইরে থেকে সবাই দেখতে পায় – ভেতর থেকে পায় না বাইরে দেখতে। এই রেডিও অফিসকে কল্পনা করে নিলাম আমার বাগানের মধ্যেই। বাগানের কোণায় যে আমগাছটা আছে সেটাই হলো রেডিও অফিস। আমি কল্পনায় দেখছি সেখানে গাছের তলায় কাচের ঘর, তারমধ্য থেকেই সবাই কথা বলছে, আমরা রেডিওতে শুনছি।

রেডিও ছিল খবরের উৎস, বিনোদনেরও। অনেকরকম অনুষ্ঠান হতো, খবর, গান, আলোচনা – স্বাস্থ্য, কৃষি, অনেক বিষয় নিয়ে। আর প্রিয় ছিল অনুরোধের আসর। অনুরোধের আসরে শ্রোতারা কোনো একটা গান শোনার জন্য অনুরোধ পাঠাত। উপস্থাপক/উপস্থাপিকা সেই গান বাজিয়ে শোনার আগে অনুরোধকারী শ্রোতাদের নাম বলতেন, সে এক বিশাল লম্বা তালিকা – এই গানটি শুনতে চেয়ে অনুরোধ করেছেন ঢাকা থেকে মিঠু, অপু, লিলি, মিলি, রাজশাহী থেকে মিনা, হেনা, লেনা, এনা – খুলনা থেকে … । এই নামগুলো শোনাও ছিল এক রকমের বিনোদন, এত বিচিত্র নাম। এইসব আধুনিক নাম, সংক্ষিপ্ত নাম শুনে নিজেই অবাক হতাম। আসলেই কি এ নামে কেউ অনুরোধ করেছে নাকি পুরোটাই বানানো?

অনুরোধের আসর খুবই জনপ্রিয় ছিল। বাবা-মারা সেসব শুনত, আমরাও শুনতাম। কৃষক মাঠে কাজ করার সময় রেডিও বাজাত, দোকানেও বাজত কখনও কখনও। বাবা-মা বাজাতেন বাড়িতে, অবসরে। খবর পাওয়া যেত, সেই খবর নিয়ে বড়দের মাঝে আলোচনা চলত। কখনো কখনো দেখেছি খবর শোনার জন্য আসর বসত, বৈঠকখানায়। অনেকেই আসত। খবর শোনা হতো। তারপর আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক। রাজনীতি, অর্থনীতি সবকিছুই চাপা পড়ে যেত সেখানে। অনেক গভীর রাত পর্যন্ত চলত সেই আলোচনা। সন্ধ্যে সাড়ে সাতটার বিবিসি, দশটায় ভয়েস অব আমেরিকা, এগারোটার আকাশবাণী এরকম বিভিন্ন চ্যানেল – কে কী বলল, কী ঘটতে যাচ্ছে – এসবই ঘুরেফিরে বলতেন বড়রা। কখনও সেরকম আসরে গিয়ে বসিনি। দূর থেকে দেখেছি দুয়েকবার। কখনো মা হয়ত পাঠিয়েছেন বাবাকে ডাকতে, জরুরী তলব। হারিকেন নিয়ে রওনা দিয়েছি সেই বৈঠকখানায়।

শুক্রবার সকালে রেডিওতে ছোটদের জন্য একটা অনুষ্ঠান হতো – কচিকাচার আসর কিংবা সোনামনিদের আসর এরকম কিছু একটা নাম। সেদিন স্কুল ছুটি। তাই অনুষ্ঠানটি শোনার জন্য অপেক্ষা করতাম। সেই অনুষ্ঠানে শুরু হতো উপস্থিত সবার পরিচিতি দিয়ে – আমার নাম মিঠু, আমার নাম মিনি, আমার নাম ইতু,… এরকম চলত। এমনই এক দিনে বাবা রেডিওর পেছনটা খুললেন। তারপর সেখানে দেখলাম কিছু তার, সার্কিট, আর কিচু জিনিস উঁচু-নিচু, পরে জেনেছি ডায়োড-ট্রায়োড। তখনই চিনে ফেললাম মিঠু, মিনি, ইতুদের। এই যে এইটা মিঠু, এইটা মিনি, এইটা ইতু। বাবাকে বললাম তা। বাবা হাসলেন।

প্রথমবার সিনেমা দেখা রাজশাহীতে, বাবার সাথে। তখন ক্লাস ওয়ানে পড়ি কিংবা আদৌ পড়ি কি না মনে নেই। বাবা অফিসের কাজে যাবেন রাজশাহী। কি মনে করে আমাকেও নিতে চাইলেন। মহা উত্তেজনাও বাইরে যাকে দেখি তাকেই বলতে থাকি আমি রাজশাহী যাবো। আমার খেলার সাথীরা কেউ বাদ রইল না জানতে। দিনটা আসলে খুব ভোরে উঠতে হলো। ফজরের আজানের পরপরই গেলাম বড় রাস্তায়, সেখানে ট্রাকে – ধুলো মাখতে মাখতে রহনপুর, এরপর ট্রেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সেখান থেকে বাসে রাজশাহী। ট্রাক, বাস, ট্রেন সবই আমার জন্য নতুন অভিজ্ঞতা। স্টেশন নেমে বাইরে তাকিয়ে অবাক। ওমা, বড় বড় সাইকেল্ সেগুলোতে আবার গরু গাড়ির মতো টোপ পড়ানো। বাবা বললেন, এর নাম রিকশা। সেই আমার প্রথম রিকশা দেখা। এরপর রাস্তায় যেতে যেত দেখলাম ছোট ছোট গাড়ি, চাকাগুলো মাটিতে ঠেকে যাবে মনে হয়। আমাদের গ্রামের পাশ দিয়ে বড় ট্রাক যেতে দেখেছি। বড় বাস দেখেছি। কিন্তু এরকম ছোট গাড়ি দেখিনি। মাথায় চিন্তা এলো এসব গাড়ির মধ্যে মানুষ বসে কীভাবে। বাবাকে সেটা জিজ্ঞেস করলে তিনি হাসলেন। পরদিন তিনি আমাকে সেই গাড়িতে চড়িয়েছিলেন। ট্যাক্সিতে করে কোথায় যেন গিয়েছিলাম।

পরদিন বাবা আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন সিনেমা হলে, সিনেমা কী জিনিস তখনও বুঝিনা। আমরা ঢুকতেই রুমটা অন্ধকার হয়ে গেল। একজন একটা লাইট নিয়ে এসে বাবার হাত থেকে টিকেট দেখে আমাদের সীট দেখিয়ে দিলেন। বসলাম। তারপর পর্দায় এটাসেটা দেখানো শুরু হলো। শব্দ শুনে ভয় পেলাম। একসময় দেখলাম আমাদের জাতীয় পতাকা পতপত করে উড়ছে। সবাই উঠে দাঁড়াল। বাবাকে দেখে আমিও উঠে দাঁড়ালাম। পতাকা দেখানো বন্ধ হলে আবার বসলাম।

এরপর শুরু হলো সিনেমা। এতদিন তেমন কিছু আর মনে নেই, সিনেমাটার নাম সম্ভবত বাল্যবন্ধু। আমি ছবি দেখতে থাকলাম আর ভাবতে লাগলাম পেছনের লোকগুলো, দৃশ্যগুলো দেখা যাচ্ছে কীভাবে? নিশ্চয় বড় একটা কাচ আছে, আর সেই কাচের পেছনে এই লোকগুলো যাওয়া আসা করছে। কিন্তু একটু পড়ে দেখলাম গাড়ি আসছে, গাছপালা সরে যাচ্ছে। এগুলো কীভাবে করছে? আচ্ছা, বুঝেছি। গাড়িগুলোও আসছে আর যাচ্ছে! গাছপালাগুলো নিয়ে আসা হচ্ছে!

সেদিন সন্ধ্যায় বাবা আমাকে নিয়ে গেলেন এক আত্মীয়ের বাসায়। সেখানে ঢোকার পর আমাদেরকে বসতে দেয়া হলো ড্রয়িং রুমে। সামনে একটা বাক্স। আমি বুঝে উঠতে পারলাম না সেই বাক্সটা কী। একটু পর সেটির উপর থেকে কাপড়ের আচ্ছাদনটি সরিয়ে নেয়া হলো, একটা চাবি ঘোরানো হল। ওমা, এটা দেখি আরেক সিনেমা! এই বাক্সের মধ্যেও মানুষজন দেখা যাচ্ছে, গাছপালা দেখা যাচ্ছে। খবর পড়ছে কেউ। বিভিন্ন দৃশ্য। বাবা বললেন, এটা টেলিভিশন। সেই শুনে অবাক হলাম ভীষণ। একবার দাঁড়ালাম। সেই বাক্সের পেছনে কী আছে দেখার চেষ্টা করলাম। না, বন্ধ। মানুষজনের পক্ষে কি এই বাক্সের মধ্যে ঢোকা সম্ভব? না। সিনেমায় হতে পারে, এখানে না। বড়ই অবাক করা জিনিস। হোটেলে ফিরে সেটি নিয়েই ভাবতে থাকলাম। রাতে ঘুমও হলো না সেটি ভাবতে গিয়ে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: