প্রস্তুতি নিন

জেতার জন্য কাউকে অবশ্যই একটি গুণ লালন করতে হবে, সেটি হলো উদ্দেশ্যের দৃঢ়তা, আসলে সে কী চায় সে সম্পর্কে জানা এবং সেটি অর্জন করার জন্য আগ্রাসী আকাঙ্ক্ষা।

নেপোলিয়ন হিল

ব্যাঙ শনাক্ত করা এবং সেটি খাওয়া শুরু করার আগে আপনাকে নির্ধারণ করতে হবে জীবনে আসলে কী অর্জন করতে চান? ব্যক্তিগত উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কী চান সে সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা। কিছু মানুষ দ্রুত অনেক কাজ করতে পারে তার কারণ তারা জানে তাদের কী করতে হবে বা তারা কী করতে চায়। তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে তাদের ধারণা পরিষ্কার এবং সেই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থেকে তারা সরে যায় না।

আপনি কী চান এবং তার জন্য আপনার কী করা দরকার সে সম্পর্কে আপনার ধারণা যত পরিষ্কার হবে, দীর্ঘসূত্রিতা বা কালক্ষেপন এড়ানো আমাদের ভাষায় ব্যাঙ খাওয়া এবং কাজ দ্রুত শেষ করা আপনার জন্য ততই সহজ হবে।

দীর্ঘসূত্রিতা এবং অনুপ্রেরণার অভাবের একটি প্রধান কারণ হলো আপনার কী করা উচিত, কোন ক্রমে, কখন এবং কেন- সে সম্পর্কে অস্পষ্টতা ও বিভ্রান্তি। এই সাধারণ সমস্যা এড়ানোর জন্য আপনাকে সকল শক্তি দিয়ে চেষ্টা করতে হবে যাতে যখনই যা কিছু করেন সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকে।

সাফল্যের প্রধান নিয়ম: কাগজে কলমে চিন্তা করুন

বয়স্কদের মাঝে শতকরা ৩ জনের পরিষ্কার, লিখিত লক্ষ্য থাকে। একই শিক্ষা ও ক্ষমতার অন্যান্য লোকের চেয়ে লক্ষ্য লিখে রাখে এমন লোকের সাফল্য পাঁচ থেকে দশ গুণ বেশি হয়। কিন্তু তারপরও বেশিরভাগ লোকই কোনো এক কারণে তাদের লক্ষ্য লিখে রাখে না।

লক্ষ্য নির্ধারণ ও তা অর্জনের জন্য শক্তিশালী এক ফর্মুলা রয়েছে যা আপনি আপনার বাকি জীবনে ব্যবহার করতে পারেন। সাতটি ধাপে এটি গড়ে উঠেছে। আপনি যদি বর্তমানে এসব ধাপ ব্যবহার না করে থাকেন তাহলে এর কোনো একটি ধাপ অবলম্বনে আপনার  উৎপাদনশীলতা দ্বিগুন বা তিনগুন হতে পারে। আমার প্রোগ্রামের অংশগ্রহণকারী অনেকেই এসব ধাপ ব্যবহার করে মাত্র কয়েক বছরে এমনকি কয়েক মাসে নাটকীয়ভাবে তাদের উপার্জন কয়েকগুণ বাড়িয়েছে।

প্রথম ধাপ: ঠিক করুন আপনি আসলে কী চান। হয় আপনি নিজে বসুন কিংবা আপনার বসের সাথে বসে আপনার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে আলোচনা করুন যতক্ষণ না আপনি আপনার লক্ষ্য সম্পর্কে পরিষ্কার স্বচ্ছ ধারণা পাচ্ছেন। আপনার বস আপনার নিকট ঠিক কী চান এবং কোন ক্রমে চান সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নিন। আশ্চর্যজনকভাবে অনেক লোক মাসের পর মাস বছরের পর বছর অর্থহীন কাজে সময় ব্যয় করছে শুধু তাদের ম্যানেজারদের সাথে এই বোঝাপড়া না থাকার কারণে।

নিয়ম: সময়ের অপব্যবহারের সবচেয়ে খারাপ একটি দৃষ্টান্ত হলো কোনো কাজ খুবই ভালভাবে শেষ করা যা করার দরকার আদৌ ছিল না

সেভেন হ্যাবিটস অব হাইলি ইফেক্টিভ পিপল গ্রন্থের লেখক স্টিফেন কোভে বলেন, ‘সাফল্যের মই বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করার আগে নিশ্চিত হোন যে সেই মই আপনার কাঙ্ক্ষিত দেয়ালে লাগানো আছে।’

দ্বিতীয় ধাপ: লিখে রাখুন। আপনার লক্ষ্য সম্পর্কে যাই ভাবুন না কেন তা কাগজে লিখে রাখুন। কাগজ-কলমে চিন্তা করুন। আপনি নিজের লক্ষ্য কাগজে লেখার মাধ্যমে সেই লক্ষ্যকে স্বচ্ছ ও দৃশ্যমান করে তুলতে পারেন। এর মাধ্যমে এমন কিছু তৈরি করেন যা আপনি দেখতে ও ছুঁতে পারেন। অন্যদিকে কোনো লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য লেখা না হলে সেটি কেবল আপনার মনের ইচ্ছে কিংবা কল্পনা হিসেবেই থাকে। এর পেছনে কোনো শক্তি থাকে না। এর পেছনে কোনো শক্তি ব্যয় করবার ইচ্ছেও আপনার থাকে না। অলিখিত উদ্দেশ্য সংশয়, অস্পষ্টতা, ভুল দিক নির্দেশনা এবং অসংখ্য ভুলের জন্ম দেয়।

তৃতীয় ধাপ: আপনার লক্ষ্যের জন্য একটি সময়সীমা নির্ধারণ করুন। কোনো লক্ষ্যের জন্য সময়সীমা বাঁধা না থাকলে সেটি বাস্তবে রূপ দেয়ার কোনো তাগিদ থাকে না। এর আসলে কোনো শুরু কিংবা শেষ থাকে না। লক্ষ্য অর্জনের জন্য নির্দিষ্ট কোনো তারিখ ঠিক না করলে আপনার সেই লক্ষ্য বাস্তবায়িত না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ এক্ষেত্রে আপনি ক্রমাগত দীর্ঘসূত্রিতার আশ্রয় নেবেন এবং সেই লক্ষ্য অর্জনে খুব অল্প কাজই অগ্রসর হবে।

চতুর্থ ধাপ: সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য যা কিছু করা দরকার এবং আপনি করবেন বলে মনে করেন তার একটি তালিকা তৈরি করুন। সেই লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক কোনো নূতন কাজের কথা মনে পড়লে সেটিও যোগ করুন। এভাবে কাজের তালিকা বাড়াতে থাকুন যতক্ষণ না সেটি সম্পূর্ণ মনে হয়। এরকম একটি কাজের তালিকা আপনাকে বৃহত্তর উদ্দেশ্য সম্পর্কে ধারণা দেবে। এটি আপনাকে বলে দেবে কোন পথে যেতে হবে। একবার এভাবে পথ এঁকে নিতে পারলে সেই লক্ষ্য অর্জন করা আপনার জন্য সহজ হয়ে যাবে। কারণ আপনি এখন জানেন কোন পথে সেখানে যেতে হবে।

পঞ্চম ধাপ: কাজের তালিকাকে একটি পরিকল্পনায় পরিণত করুন। আপনার কাজের তালিকাকে অগ্রাধিকার ও ক্রমানুসারে সাজান। কোন কাজটি আগে করতে হবে আর কোনটি পরে করা যেতে পারে সেটি নির্ধারণের জন্য কয়েক মিনিট ব্যয় করুন। কোন কাজটি সবার আগে করা দরকার, আর কোনটি সবার পরে করা দরকার সেটি ভালভাবে চিন্তা করে বের করুন। একটি কাজের সাথে আরেকটি কাজের সম্পর্কও বের করুন। পারলে চিত্রসহকারে আপনার পরিকল্পনাকে উপস্থাপন করুন- বিভিন্ন রঙের বৃত্ত, বর্গক্ষেত্র, আয়তাকার ইত্যাদি ব্যবহার করে সেটিকে হৃদয়গ্রাহী করে তুলুন যাতে সেই পরিকল্পনা আপনার অন্তরে গেঁথে যায়। এভাবে কাজকে সাজানোর সময়ই বুঝতে পারবেন যে বড় কোনো লক্ষ্য অর্জন সম্ভব এরকম ছোট ছোট কাজের মাধ্যমেই।

লিখিত লক্ষ্য এবং গোছালো কর্ম পরিকল্পনার ফলে আপনি আরো অনেক বেশি উৎপাদনশীল এবং কর্মদক্ষ হয়ে উঠবেন। কারণ আপনার মনে এখন সেই লক্ষ্য এবং সেখানে পৌঁছানোর পথ গেঁথে গেছে।

ষষ্ঠ ধাপ: আপনার কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে তখনই তৎপর হোন। আপনার তৈরিকৃত কর্মপরিকল্পনা অনুসারে কাজ শুরু করে দিন। কিছু করুন, সামান্য হলেও। আগামীকালের জন্য অপেক্ষা না করেই। অসাধারণ মানের পরিকল্পনা তৈরি কিন্তু কিছু না করার চেয়ে সাধারণ মানের কোনো পরিকল্পনা তৈরি ও সে অনুসারে কিছু করা অনেক ভাল। আপনার লক্ষ্য অর্জনের জন্য এই পরিকল্পনা অনুসারে কাজ করা অবশ্যই দরকার। কাজ ছাড়া কিছু হবে না। লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য কেবল পথ পেলেই হবে না, সেই পথে হাঁটতে, দৌড়াতে কিংবা গাড়ি চালাতে হবে। তাই দেরি না করে আজই হাঁটা শুরু করুন।

সপ্তম ধাপ: আপনাকে সেই লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নেবে প্রতিদিন এমন কিছু করার সংকল্প করুন। এসব কাজ আপনার প্রাত্যহিক কাজের অংশ হিসেবে নিন। কোনো বিষয়ে প্রতিদিন কয়েক পৃষ্ঠা পড়ুন। প্রতিদিন কয়েকজন মক্কেলকে ফোন করুন। প্রতিদিন কিছু সময় ব্যায়াম করুন। প্রতিদিন কিছু সংখ্যক বিদেশী শব্দ শিখুন। কোনো দিন বাদ দেবেন না। আপনার লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য যে রোড ম্যাপ তৈরি করেছেন সেই ম্যাপ ফেলে রাখলে চলবে না, সেই পথে গাড়ি চালাতে হবে। গাড়ি চালাতে হবে ক্রমাগত, থামা চলবে না। থামলেই দেরি হয়ে যাবে, লক্ষ্য চলে যাবে নাগালের বাইরে।

প্রতিদিন সামনে এগোন, এক ধাপ হলেও। একবার চলতে শুরু করলে চলতে থাকুন। থামবেন না। এই সিদ্ধান্ত, এবং এই শৃঙ্খলাই আপনাকে সবচেয়ে উৎপাদনশীল ও সফল মানুষ হিসেবে পরিচিত করে দেবে।

পরিষ্কার লিখিত লক্ষ্য আপনার চিন্তার উপরে এক বিশাল প্রভাব ফেলবে। এটি আপনাকে অনুপ্রাণিত করবে এবং আপনাকে কাজের মাঝে ডুবিয়ে দেবে। এটি আপনার সৃজনশীলতাকে উজ্জীবিত করবে, কর্মোদ্যম বাড়িয়ে তুলবে, এবং কালক্ষেপণ এড়াতে সাহায্য করবে।

অর্জনের জন্য লিখিত লক্ষ্য জ্বালানি হিসেবে কাজ করবে। আপনার লক্ষ্য যত বড় ও যত পরিষ্কার হবে সেটি অর্জনে আপনার উদ্দীপনাও তত বাড়বে। আপনি সেই লক্ষ্য সম্পর্কে যত ভাববেন, সেটি অর্জনের জন্য আপনার আকাঙ্ক্ষা তত বাড়বে। ততই বাড়বে আপনার অন্তর্তাগিদ।

প্রতিদিন আপনার লক্ষ্য সম্পর্কে চিন্তা করুন এবং আপনি সেই লক্ষ্যের দিকে কতদূর অগ্রসর হলেন তা যাচাই করুন। প্রতিদিন সকালে কাজ শুরুর সময় আপনার সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেই কাজটি করুন যা আপনাকে লক্ষ্যের দিকে এক ধাপ এগিয়ে নেবে।

Series Navigation<< শুরুর কথা

Leave a Reply

%d bloggers like this: