ফ্যাঙচ্যাঙগ্যাঙ

এই সেই চীন। কনফুসিয়াসের চীন। মাওসেতুঙের চীন। 

সৌরভ বলল, এবার আমাদের জ্ঞানার্জন শেষ।

কীভাবে?

কেন, জানিস না, আল হাদিসে কী বলেছে? জ্ঞানার্জনের জন্য সুদূর চীন দেশ পর্যন্ত যাও। চীনে যখন এসে পড়লাম তখন আর বাকি রইল কী?

কিন্তু চীনতো এখনও দেখলাম না!

জাহাজ বন্দরে ভেড়ার পরই বাইরে এসে কয়েকবার তাকিয়েছি। কেমন দেশ চীন? মানুষগুলো কেমন? চীনাদের নিয়ে আমাদের আমাদের দেশে নানা কিংবদন্তী আছে। তার সবই কি সত্যি? সত্যিই কি এখানকার লোকরা অলস – এবং বউয়ের ঠ্যাঙানি ছাড়া কাজ করে না?

বাইরে তাকিয়ে দেখি শহরটা উঁচুনিচু পাহাড়ে ভর্তি। দূরে বেশ বড় বড় বিল্ডিং দেখা যাচ্ছে। সবুজ পাহাড়ের উপর ছোট ছোট ঘর বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে। কিন্তু পোর্ট এলাকাটা বেশ নোংরা। বাতাসে ধুলো উড়ছে। পাশেই সিমেন্ট কারখানা। কনভেয়র দিয়ে কারখানার সিমেন্ট বোঝাই করা হচ্ছে জাহাজে। বাতাসটাও আসছে সেদিক থেকেই। সমস্ত দরজা-জানালা বন্ধ করে দিয়েছি যাতে আমাদের বাসস্থান নোংরা হতে না পারে।

সকাল থেকে আমার ডিউটি। নানারকম কাজ। ইঞ্জিনরুমে শব্দের সাথে বসবাস। নানারকম শব্দ। একটানা, একঘেয়ে। প্রথম প্রথম অসহ্য লাগত। এখন ভালই লাগে। মনে হয় মোৎসার্ট কিংবা বিটোফেনের সঙ্গীত। সে শব্দে ঘুম ভাল হয়।

সারাদিন এটাসেটা করি। কিন্তু সময় যেন যেতে চায় না। কখন বাজবে চারটা সেই আশায় বারবার ঘড়ির দিকে তাকাই। 

দুপুরের পর সবাই উধাও হয়ে যায়। শহরে যাওয়ার জন্যে শোর পাস পাওয়া গেছে। সৌরভ ইতিমধ্যে চলে গেছে। চারটার পর আমরা যাব। আমি আর আলী। সেও খুব আগ্রহ নিয়ে বারবার ফোন করছে- ‘চারটার পর দেরি করবি না কিন্তু। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিস।’

আমাদের সলিমদ্দিও বারবার এসে জিজ্ঞেস করছে, স্যার, বাইরে যাইবেন না?

সলিমদ্দি হলো গ্রীজার, বাংলায় বলা যায় তৈল প্রদায়ক। শব্দটা বন্ধু রফিকের আবিষ্কার। ও একদিন এসে বলল, দোস্ত, তোদের অগ্নিপুরুষ কোথায়?

‘অগ্নিপুরুষ? সেটা আবার কি?’ আমাদের অবাক হবার পালা।

ও বলল, ‘তোরা সব বাংলা ভুলে গেলি না কি? বাংলা ছেড়ে অযথা কেন ইংরেজিতে বলিস ফায়ারম্যান? গ্রীজার না বলে বলবি তৈল প্রদায়ক।’

কলকবজায় তেল দেয়া হয় বলে না হয় গ্রীজারকে তৈলপ্রদায়ক বললাম, কিন্তু অগ্নিপুরুষ কথাটা কেমন লাগে? তবু দেখি রফিক মৃধার কথামতো অগ্নিপুরুষ এবং তৈলপ্রদায়ক শব্দ দুটো চালু হয়ে গেছে। শুধু আমাদের জাহাজে নয়, ‘বাংলা’র সব জাহাজে।

তৈলপ্রদায়ক সলিমদ্দি বুড়ো মানুষ। তার নাবিক জীবন তিরিশ বছরের। তার অভিজ্ঞতার কাছে আমরা কিছুই না। তাকে জিজ্ঞেস করি, ‘চীনে এসেছেন কখনো?’

সলিমদ্দি মাথা নাড়ে, ‘না, চীনে কখনো আসিনি, স্যার!’

‘তাহলে আর দেখলেন কী? চীন না দেখলে পৃথিবী দেখা অসম্পূর্ণ, জানেন এটা?’

‘হ, এইবার পৃথিবী দেখা শ্যাষ হইব, আমার চাকরিও শ্যাষ হইব’, এই বলেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সলিমদ্দি।

অল্প কিছুদিন পরই তার নাবিক জীবন শেষ হয়ে যাবে। প্রায়ই বলে সে কথা। খুব আফসোস তার, ‘বুঝলেন স্যার, সীম্যানগো জীবন হইল কঠিন জীবন। একবার ধরলে ছাড়তে পারবেন না।’

আমিতো ছেড়ে দিতে চাই, বলি সলিমদ্দিকে।

‘পারবেন না স্যার, পারবেন না,’ বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়ে সে। ‘একবার ফ্রেশওয়াটার জেনারেটরের পানি যে খায় সে কখনও এ পেশা ছাড়তে পারে না।’

আগে শুনেছি যে নাকি একবার সমুদ্রে যায় সে কখনও ডাঙায় ফেরে না। সমুদ্রের নেশা চেপে বসে। সলিমদ্দিও কি সেই কথাই বোঝাতে চাইছে? হবেও বা। ফ্রেশওয়াটার জেনারেটরের পানি খাওয়া মানেই তো গভীর সমুদ্র পাড়ি দেয়া। গভীর সমুদ্রে গেলে সমুদ্রের লোনা পানি থেকে খাওয়ার জন্য স্বাদু পানি তৈরি করা হয় এই জেনারেটরে। আসলে সমুদ্রের পানিকে ফোটানো হয়, বাষ্পীভূত করা হয়। সেই বাষ্প থেকে স্বাদু পানি তৈরি করা হয়। সেটিই ব্যবহার করা হয় গোসল ও খাওয়ার কাজে। তবে কেবল জাহাজে খাবার পানির মজুদ শেষ হয়ে গেলেই এই পানি খাওয়া হয়। এটি বিশুদ্ধ বটে, কিন্তু এতে কোনো খনিজ পদার্থ থাকে না বলেই ডাঙা থেকে খাবার পানি মজুদ করে নেয়া হয়। গভীর সমূদ্রে জাহাজ চলার সময় আমরা এই জেনারেটর চালিয়ে দেই এবং লোনা পানি থেকে স্বাদু পানি বানিয়ে ট্যাংক ভর্তি করি।

সলিমদ্দির কথা শুনে ভাবতে বসলাম। আমি কি সত্যিই সমুদ্রের নেশায় আক্রান্ত হবো? ব্যক্তিগতভাবে আমি কোনো নেশায় আসক্ত নই। না শুরার, না সিগারেটের, না নারীর। তবে একটি নেশা আমাকে সবসময় বিব্রত করে রাখে। পুরো জীবনটাকে অনেকক্ষেত্রে দখল করে রাখে – সেটি হলো জানার নেশা। জানতে চাই প্রচন্ডভাবে। নূতন কিছু – নূতন বিষয়। আর একবার জানা হয়ে গেলে সেটিতে পুরো আগ্রহই হারিয়ে ফেলি। আমার এই নাবিক জীবন কেবল শুরু। এরপর যখন এর অনেককিছু জেনে ফেলব – আর কোনো রহস্য অবশিষ্ট থাকবে না তখন হয়তো আর কোনো আগ্রহ পাবো না এতে। হারিয়ে ফেলব সব আগ্রহ, ফিরো যাবো ডাঙায়। ব্যস্ত হয়ে পড়ব নূতন কিছু নিয়ে! হয়ত বা তাই, কিংবা নয়। হয়ত সলিমদ্দির কথামতো সমুদ্রের নেশা পেয়ে বসবে।

সলিমদ্দির সাথে কথা বলতে বলতে চারটা বেজে যায়। সৌরভ আসে ডিউটিতে। ওর মুখে শুনি ফ্যাঙচ্যাঙগ্যাঙ সিটির কথা। বাইরেটা কেমন, যাওয়া যাবে কি না, ইত্যাদি। ও আরাম করে চেয়ারে বসে। তারপর বলে, বাইরে যাবি আপত্তি নেই। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারদের মনে রাখা দরকার সেফটি ফার্স্ট! নিরাপত্তার জন্য প্রচুর গরম কাপড় পড়ে নিবি, যতগুলো আছে সব। পারলে একটা হিটার লাগিয়ে নিস গায়ের সাথে। এক ডলার ব্যাঙ্কে ভাঙালে পাবি আট দশমিক দুই তিন ইউয়েন, আর কালোবাজারে আট দশমিক তিন পাঁচ। ভয় পাওয়ার কিছু নেই, রাস্তায় বেরুলেই সব চিনতে পারবি। রিকশায় উঠলে এক ডলার জলে যাবে। আর কোনো দোকানে গিয়ে কারো সাথে কথা বলার আগে দেখে নিবি ওটা নড়েচড়ে কি না, মূর্তির সাথে যেন কথা না বলিস। এখানে মূর্তি আর মানুষের পার্থক্য বোঝার ওই একটাই উপায়।

সৌরভের দীর্ঘ বক্তৃতা শেষ হলে ইঞ্জিনরুম থেকে বিদায় নিই।

গোসল না সারতেই আলী এসে হাজির। আমি এখনও রেডি হতে পারিনি বলে তার অভিযোগ – তোঁর এ্যাতো দেঁরি হঁয়। এর নাকি স্বরটা কমবার কোনো লক্ষণ নেই। দেখি বেশ ভালমতোই সেজেছে আলী। গলায় মাফলার, গায়ে জ্যাকেট, হাতে গ্লাভস। সৌরভের সতর্কবানী মনে রেখে জামাকাপড় পড়ে নিই। হাইফঙ থেকে কেনা সোয়েটারটা কাজে লাগে। সোয়েটারটা পড়ে নিই। জাহাজ ছাড়ার দুদিন আগে আমি আর সৌরভ দুটো জ্যাকেট কিনি, খুবই কম দামে। কিনেছিলাম চট্টগ্রামে জলসা সিনেমা হলের সামনে কোর্ট বিল্ডিঙের উপর হকার্স মার্কেট থেকে। জ্যাকেটের ব্যবহার এখনও হয়নি। আজ সেটি গায়ে চাপালাম। তারপর সেই চট্টগ্রাম থেকেই কেনা মাঙ্কি টুপি এবং হাতে রাবারের দস্তানা। এই সাজপোশাক জীবনে কখনোই নিইনি। তাই ক্যামেরাটা সঙ্গে নিতে ভুলি না।

জাহাজ থেকে কেবল নেমেছি। এমন সময় এলো এক দমকা হাওয়া। ধুলায় ছেয়ে গেছে চারপাশ। কিছু দেখা যাচ্ছে না। চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকি। কিছুক্ষণ পর চারপাশ পরিষ্কার হলে দুজনে হাঁটা শুরু করি। গোটা রাস্তাটাই নোংরা। সিমেন্ট পড়ে বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা।

কনকনে শীতের মধ্যে আমরা হেঁটে যাচ্ছি। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। বন্দরের প্রধান ফটক পেরিয়ে দেখতে পাই ট্রাফিক আইল্যান্ড। না, ট্রাফিক আইল্যান্ড না, এটি আসলে একটি ভাস্কর্যের স্থাপনা! কেউ একজন হাত উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে কোনো কম্যুনিস্ট নেতা হবে – মাওসেতুং হতে পারে। কিন্তু আমরা আধোআলোয় ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না।

গেট পেরুনোর সময় কেউ কিছু বলল না। গেটের বাইরে কিছু রিকশা দাঁড়ানো। ওগুলো আমাদের দেশের মতো নয়। দেখতে অনেকটা ভ্যানগাড়ির মতো। পেছনে ঘর, উপরে ছাউনি, ঠিক যেন স্কুল ভ্যান। আমাদেরকে দেখে কয়েকজন ডাকাডাকি করল। কিন্তু আমরা কর্ণপাত করি না। একটা ছবি তুলে নিই ওই ভাস্কর্যের।

একটু এগিয়েই আমরা দেখতে পাই ব্যাংক অব চায়না। বিশাল দালান। এখন সন্ধ্যা বলে ব্যাংক বন্ধ। পাশে একটা মানিচেঞ্জারের চেম্বার। ঢুকেই দেখি সুন্দর ফুটফুটে এক চীনা তরুনী। ডলারের দাম কতো? জানতে চায় আলী। চীনা তরুনী তার চ্যাঙচুং ভাষায় কী বলে বুঝতে পারি না। ফ্যালফ্যাল করে আমরা তার দিকে তাকিয়ে থাকি। তার ভাষা না বোঝার জন্য নাকি সৌন্দর্য উপভোগের জন্য তা ঠিক বলতে পারব না। এবার ওই তরুনী একটি বোর্ডের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। দেয়ালে টাঙানো চার্টে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার দেয়া আছে। এটা এতক্ষণ নজরে আসে নি বলে নিজেকেই একটা গাল দেই। এই চীনা তরুনীকে দেখেই এই অবস্থা হলে বাকি সময়টা কী হবে! সেই চার্ট অনুসারে এক ডলারের বিপরীতে আমরা পাব ৮.২৩ ইউয়ান। কিছু ডলার ভাঙিয়ে আমরা বেরুলাম। তরুনীটি বলল, গুডবাই। আমরা শুনলাম, খুব খাই। হয়ত ক্ষুধা লেগেছে বলেই এটি শুনলাম!

পেটে ক্ষুধা থাকলেও আমরা এখনই খাবার পাবো না। কারণ কেউ আমাদের জন্য এখানে ব্যাংক অব চায়নার সামনে খাবার নিয়ে বসে নেই। অবশ্য অনেকেই আমাদের খাবার নিয়ে বসে আছে, আমাদের কাজ হলো তাদের খুঁজে বের করা। একবার তাদের কাছে পৌঁছাতে পারলে খাবার পাব, মুদ্রার বিনিময়ে। সেই আশায় আরো একটু সামনে এগোই দু’জনে।

ছোট্ট শহর এই ফ্যাঙচ্যাঙগ্যাঙ সিটি। নূতন দালানকোঠা গড়ে উঠছে চারপাশে। রাস্তাগুলো খুব একটা প্রশস্ত নয়, আমাদের দেশের জেলা শহরগুলোর মতো অনেকটা। রাস্তায় ভিড়ও নেই তেমন। দু’একটা গাড়ি চলাচল করছে। তবে সাইকেল তেমন নজরে পড়ছে না। শুনেছি চীনের রাস্তা গিজ গিজ করে সাইকেলে। কিন্তু বাস্তবের সাথে এখন মেলাতে পারছি না। ভাবলাম সন্ধ্যাবেলা বলেই হয়ত এমন ফাঁকা। দিনের বেলা দেখলে আসল ব্যাপারটা বোঝা যাবে।

রাস্তার পাশে কয়েকটা ইটালিয়ান হোটেল নজরে পড়ল। সামনে একগাদা নুডলস স্তুপ করে রাখা আছে। চাইনিজদের সেই বিখ্যাত কেঁচোর স্তুপ দেখে মোটেই ভাল লাগল না। আরও ভাল লাগল না যখন দেখলাম একগাদা শামুক, ঝিনুক রান্না করা হচ্ছে কড়াইয়ে করে। ওসব মিশিয়ে পরিবেশন করা হচ্ছে চাইনিজ নুডলস। আমি দাঁড়িয়ে না দেখে পারছি না। কয়েকজন মিলে ডাকাডাকি শুরু করেছে কাম কাম, ইট ইট! অর্থাৎ আসুন আসুন, খেয়ে যান। পেটে ক্ষুধা আছে কিন্তু তারপরও এত সুন্দর আমন্ত্রণে সাড়া দিতে নারাজ আলী। আমার তেমন অসুবিধে নেই। ভাবছিলাম এই সুযোগে আসল চাইনিজ খাওয়া যেত। চঁল, আঁর কঁত দেঁখবি – বলে হাত ধরে টানতে থাকে আলী।

সামনে পড়ল একটা স্টেশনারী দোকান। আমাদের বয়সী এক যুবক হাতে ক্যালকুলেটর নিয়ে ডাকছে, ‘কাপ্তেন কাপ্তেন মানি চেঞ্জ।’ বুঝলাম ও ব্যাটা মানি চেঞ্জার। এর কাছে ডলার ভাঙালে সৌরভের কথামতো পাওয়া যাবে আট দশমিক তিন পাঁচ ইউয়ান। এ ব্যাটা খাঁটি ব্যবসায়ী এবং নাবিকদের সাথে কারবার করে অভ্যস্ত। নাহলে আমাদের মতো দুজন পুচকে ছেলেকে কাপ্তেন বানাবে কেন?

তার ডাক না শুনে আরও সামনে এগুই। এক পর্যায়ে গিয়ে দেখি রাস্তা শেষ। কেবল বাঁদিকে গেছে একটা রাস্তা। ওপথে আরও কিছুদূর এগোই। এবার পেয়ে যাই আমাদের ঘোরার মতো জায়গা। বেশ ঝলমলে এক মার্কেট। সিটি সুপারমার্কেট। আমাদের দেশের সুপারমার্কেটের মতো নয়। এটি সত্যিই সুপার! কি বিশাল তার বিস্তৃতি!

মার্কেটের নিচতলায় খাবার দোকান। পেস্ট্রি ও ফাস্টফুড ছাড়া কিছু নেই। আর আছে গুঁড়ো দুধ, চা ও নানারকম হেলথ ড্রিঙ্কস। দ্বিতীয়তলায় পোশাকের দোকান। গোটা ফ্লোর জুড়ে পোশাকের সমাহার। কয়েকটা সেকশনে বিভক্ত। এক সেকশনে নারী, এক সেকশনে পুরুষ, আরেক সেকশনে শিশুদের পোশাক।

ঘোরাফেরা করি। এখানে দামদর করার বালাই নেই। দাম জিজ্ঞেসেরও দরকার নেই। প্রতিটি আইটেমের গায়ে দাম লেখা আছে। কম বা বেশিতে বিক্রি হবে না।

আমার আগ্রহ বরাবরই বইয়ের প্রতি। প্রতি বন্দরে আগে খোঁজ করি বই আর ম্যাগাজিনের। প্রথমবারের মতো দেশের বাইরে এসে ভিয়েতনামের মাটিতে ইংরেজি কিছু খুঁজে না পেয়ে বেশ খারাপ লেগেছে। এখানে এসে এখন পর্যন্ত তেমন কিছুর সন্ধান পাইনি। আসার পথে একটা ম্যাগাজিন স্টলে ঢুঁ মেরেছি। এই মার্কেটের একপাশে বই ও স্টেশনারির দোকান। ওখানেও তেমন কিছু নেই। তবে সুন্দর সুন্দর নোটবুক নজরে পড়ল, রাইটিং প্যাডও আছে। দাম নাগালের মধ্যেই। দুজনে দুটো নোট বুক কিনি। জলরঙের একটি সেটও নিই। টিউবে ভরা জলরঙের পেস্ট। পানিতে গুলে নিয়ে দিব্যি ছবি আঁকা যাবে। আজ এখানে এ জিনিসটা পেয়ে বেশ খুশি খুশি লাগে। মনে পড়ে যায় ছোটবেলার কথা। এরকম রঙতুলির কি শখটাই না ছিল তখন! বাবা যেদিন আমার হাতে প্রথম রঙতুলি তুলে দেয় সেদিন সারারাত ঘুমুতে পারিনি। পরদিন প্রথম ছবিটা এঁকেছিলাম, একটা গোলাপ ফুল। রঙের ছোঁয়ায় অদ্ভুত লাগছিল। পরে আমারই এক সহপাঠী ছবিটা কিনে নিয়েছিল পঞ্চাশ পয়সায়। সে কথা মনে পড়লে আজ হাসি পায়। আমার বিক্রিত প্রথম ও শেষ চিত্রকর্ম সেটি! তারপর তুলির চর্চা তেমন করা হয়নি। আজ হাতের কাছে রঙতুলি পেয়ে ইচ্ছেটা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। জাহাজে বসে এক বন্দর থেকে আরেক বন্দরে যাওয়ার সময় অথৈ সাগরে বসে ছবি আঁকব। সে ছবি একদিন বিশ্বখ্যাত হতেও পারে। ভ্যান গগের নিরালা দ্বীপ আর আমার জাহাজ সমান মর্যাদা পেতেও পারে! কল্পনার ফানুস ওড়াতে পয়সা লাগে না। বরং বিনে পয়সায় অনেকটা আনন্দ পাওয়া যায়।

আলী খোঁচা দিয়ে বলে, চল ফিরে যাই। বাইরে শীত জেঁকে বসেছে দেখে জাহাজে ফিরতে রাজি হই। মার্কেট থেকে বেরিয়ে রাস্তার উল্টা পাশ দিয়ে হাঁটতে থাকি। সামনে একটা বিল্ডিং পড়ে। অদ্ভুত তার আলোকসজ্জা। প্রতিটি ইটের টুকরো থেকে যেন আলো ঠিকরে পড়ছে। ওটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকি।

আরেকটু সামনে গিয়ে পেয়ে যাই একটা বইয়ের দোকান। বেশ বড়। নাম লেখা সেন্ট্রাল বুক শপ। সরকার পরিচালিত বলে মনে হচ্ছে। ইংরেজি বই পাওয়া যাবে এই ভেবে ভেতরে ঢুকি। সারি সারি বই র‌্যাকে সাজানো। বেশিরভাগই চীনাভাষায়। একপাশে অনেকগুলি বইয়ের শিরোনাম ইংরেজিতে দেখতে পাই। হ্যাঁ, তাইতো – থরে থরে সাজানো জ্যাক লন্ডন, টমাস হার্ডি, চার্লস ডিকেন্স, জেন অস্টিন – আরো অনেক ইংরেজ লেখকের বই। কাছে গিয়ে একটা হাতে নিতেই আনন্দ উধাও হয়। সবগুলো ইংরেজি ক্লাসিক চীনাভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। প্রচ্ছদে ইংরেজি থাকলেও ভেতরে সব চীনাভাষায়। সব কটা র‌্যাক তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কোনো ইংরেজি বই পেলাম না।

বইয়ের দোকান থেকে বেরিয়ে কেবল দুই পা বাড়িয়েছি এমন সময় এক যুবক এসে আমাদের সামনে দাঁড়াল। বলল, এক্সকিউজ মি!

ভাল করে তার মুখের দিকে তাকালাম। এ যুবককে একটু আগে বইয়ের দোকানে দেখেছি। মাঝে মাঝে আমাদের দিকে তাকাচ্ছিল বলে মনে পড়ছে।

সে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, মাই নেম ইজ জুয়াং।

আমরাও নিজেদের পরিচয় দিলাম।

সে বলল, আমি ইংরেজি শিখেছি।

সে যে ইংরেজি শিখেছে তার নমুনা আমরা এর মধ্যেই পেয়েছি। সে ইংরেজি শিখেছে বলেইতো সাহস করে আমাদের সাথে কথা বলতে এসেছে। তবু তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কেন ইংরেজি শিখেছ? 

উত্তরে সে যা বলল তা সোজা কথায় দাড়ায় – সে লেখাপড়া শেষ করেছে কিন্তু এখনও চাকরি পায়নি। ইংরেজি শিখলে অফিসের সেক্রেটারি হতে পারবে। আর মাসখানেক পরই তার ইংরেজি শেখা শেষ হবে।

আমরা তার সাফল্য কামনা করি এবং আমাদের জাহাজে আসার আমন্ত্রণ জানাই। সুবিধামতো সময়ে সে আমাদের জাহাজে আসবে বলেও কথা দেয়।

ফেরার পথে আবার ম্যাগাজিন স্টলে খোঁজাখুঁজি। কয়েকটা ম্যাগাজিন নজরে পড়ল। প্রচ্ছদে উত্তেজক কিছু দৃশ্য; ভেতরে কী আছে দেখার উপায় নেই। পিনআপ। মাওসেতুঙের দেশে পশ্চিমা সংস্কৃতি ঢুকে পড়েছে। এর আগে ভিয়েতনামেও দেখলাম একই অবস্থা। পশ্চিমা কালচার, দেহব্যবসা সবই বিস্তৃতি পেয়েছে, ভালমতোই।

জাহাজে ফিরলে সুকানি জিজ্ঞেস করে, স্যার, রাত করলেন যে। ম্যাসাজে গেছিলেন নাকি?

তার কথা শুনে রাগ হয়। কিসের ম্যাসাজ, কোথায় ম্যাসাজ তারতো কিছুই জানি না।

পরদিন বিকেলে আবার বেরোই। এবার তিনজনে – আমি, আলী আর সৌরভ। আবার সেই পুরনো জায়গায়। তবে একটু অন্যপথে। পথটা দেখিয়ে দেয় সৌরভ। আর ওপথে যেতেই নজরে পড়ে অন্য দৃশ্য। রাস্তার পাশে অনেক রেস্টুরেন্ট – বেড়া দিয়ে ঘেরা, সামনে খাবার সাজানো। নজরে পড়ার মতো করে টাঙানো আছে আস্ত একটা কুকুর। জ্যান্ত নয়, সেদ্ধ করা। গায়ের চামড়া খুলে নিয়ে ঝলসানো হয়েছে। তবু আকৃতি আর মাথা দেখে চিনতে ভুল হবে না। কিন্তু আলী মানতে রাজি নয় যে ওটি কুকুর। আমরা যতই বলি ওটা কুকুর, ও ততই বলে ওটা কুকুর নয়। কুকুর কেউ খায় নাকি?

হ্যাঁ, খায়। তাইওয়ানের লোকরা কুকুর খায়। জবাব দেয় সৌরভ।

সত্যিই তাই। কুকুরমাংস তাইওয়ানীদের প্রিয় খাদ্য। তাইওয়ানতো একসময় চীনেরই অংশ ছিল। এখানকার এরাও নিশ্চয় খায়। টাঙানো কুকুর দেখে সন্দেহ থাকার কথা নয়। তবু আলীর সন্দেহ দূর করতে দোকানটার কাছে যাই। দোকানী তরুনী এগিয়ে আসে। বসবার চেয়ার দেখিয়ে দেয়। কুকুরটার দিকে আঙুল দিয়ে দেখায়। ও সম্ভবত বলতে চাইছে, ওহে নাবিকবৃন্দ, আপনারা বসুন। আমার দোকানে অতি উপাদেয় কুকুর মাংস রহিয়াছে। কিন্তু তার আমন্ত্রণে আমরা সাড়া দিই না। ভেতর থেকে একজন এগিয়ে আসে। কুকুরটাকে দেখিয়ে সে বলে, দগ দগ। দিস দগ, ভেরি তেসতি!

একথা শোনামাত্র আলী দোকান থেকে বেরিয়ে আসে। মনে হলো এক্ষুনি সে বমি করে দেবে। আমাদের বাঙালি সংস্কার আমাদেরকে সেই উপাদেয় খাদ্য আহার করা হতে বিরত রাখল।

গতকালের দেখা সেই সুপারমার্কেটে এসে পেস্ট্রি খাওয়ার প্রস্তাব করি। সৌরভ খেতে রাজি। কিন্তু আলী কিছুতেই খাবে না। ওর ধারণা পেস্ট্রির মাঝেও কুকুরমাংসব দেয়া আছে। কুকুরমাংস খেয়ে ও ধর্মচ্যুত হতে চায় না। আমরা দুজন তেমন ধার্মিক নই, ধর্মভীতিও নেই। তাই পেস্ট্রি গলাধকরণে মোটেও বাধল না। 

আমাদের খাওয়া দাওয়ার শেষ পর্বে আমাদের সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার সস্ত্রীক এসে হাজির। টুকটাক কথা হলো। ভাবীর আকর্ষণ কসমেটিকস আর জামাকাপড়ের প্রতি। এখানে ওদুটোর তেমন বাহার নেই। আমরা উঠে যাই তিনতলায়। হরেকরকম খেলনায় ভরপুর পুরো ফ্লোর। একপাশে সাজানো সুন্দর সুন্দর স্কুলব্যাগ – সৌরভ একটা কিনল। বেশ চকমকে। দাম আশি টাকা মাত্র।

এদিক সেদিক কিছুক্ষণ ঘোরার পর জাহাজে ফেরার জন্য পা বাড়াই। পোর্ট গেটের কাছাকাছি এসে পড়েছি। ডাইনে স্টেট ব্যাংক অব চায়না’র বিশাল বিল্ডিং। ওটার সামনে আসতেই দু’জন মেয়ে পথ আগলে দাঁড়াল।

আলীকে পছন্দ হলো না ওদের। ও ফ্রেন্দ বলে দুজনে হাত ধরল আমার আর সৌরভের। ওদের গা থেকে ভেসে আসছে উগ্র সেন্ট। ঠোঁট রাঙানো লাল লিপস্টিকে। আমাদের হাত ধরে জিজ্ঞেস করে, হোয়ার ফ্রম ইউ?

ফ্রম বাংলাদেশ, জবাব দেয় সৌরভ।

বাংলাদেশ হোয়ার, একজন প্রশ্ন করে।

সৌরভ একটা কুৎসিত গালি দিয়ে বসে। গালিটা বাংলায় বলে ওরা বুঝতে পারল না। আমি বলি, নিয়ার ইন্ডিয়া।

ইন্ডিয়া সম্পর্কে ওদের ধারণা আছে বলে মনে হলো না। তবু দুজনে বেশ চেনার ভান করল। তারপর পেশ করল তাদের আরজি। ও ফ্রেন্দ, ইউ লাইক মি?

কী বলব আমরা? কোনো মেয়ে এসে যদি গলা জড়িয়ে ধরে বলে, বন্ধু আমাকে তোমার মনে ধরে? তাহলে কী বলা উচিত? এক মহিলার পত্র পেয়ে সমারসেট মম না করতে পারেননি। রেস্টুরেন্টে গিয়ে পকেট ফাঁকা করে ফেলেছিলেন। মেয়েদের মুখের উপর না বলাটা সত্যিই কঠিন। তাই হয়তো সৌরভ বলে ফেলে, হ্যাঁ বন্ধু তোমাদের বহুৎ মনে ধরেছে। কিন্তু আমাদের হাতে যে সময় নেই। পরে কথা বলব, কেমন?

তবু ওদের বাহুবন্ধন থেকে মুক্তি নেই। ওরা বেশ মোহনীয় ভঙ্গিতে প্রস্তাব দেয়, ফ্রেন্দ, ম্যাসাজ ম্যাসাজ, গুড ম্যাসাজ!

আমরা জানি কেন ওরা গলা ধরে ঝুলছে। এখানে দেহব্যবসা চলে ম্যাসাজের অন্তরালে।

বেশ কষ্টে ওদের বাহুবন্ধন থেকে মুক্ত হই। বলি, আগামীকাল আসব। তবু ওদের আবদার, নো, টু ডে।

আমরা মেয়ে দুটোকে পাশে ঠেলে সামনে এগুই। এতক্ষণ আলী একপাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। প্রকাশ্য রাস্তায় এরকম কারবার দেখে স্তম্ভিত। ওরা তখনও বলছে, ও ফ্রেন্দ সী ইউ টুমরো। সৌরভ আরেকটা খিস্তি ছুঁড়ল ওদের উদ্দেশ্যে।

বন্দর

পোর্ট গেটের ভেতরে ঢুকে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। যাক, এবার কোনো মেয়ের বাহুবন্ধনে আটকাতে হবে না।

কনকনে শীতের মধ্য থেকে আমরা জাহাজে গিয়ে উঠি। আজ যা ঘটল তা সত্যিই এক নূতন অভিজ্ঞতা। সৌরভ ও আমি দুজনেই ছুটে যাই মোস্তফার কাছে। ও শুনে বলে, সাবধান! ওদের কথা শুনছস কি ফাঁসছস।

তার কথার প্রমাণ পেলাম পরদিন। দুপুরে ইঞ্জিনরুমে কাজের চাপ কমার সাথে সাথে খবরটা দিল সলিমদ্দি। বলল, স্যার শুনেছেন নাকি চিফ কুকে কী করেছে? বললাম, না, কী করেছে?

চীফকুক কী করেছে সেটি আমার জানার কথা নয়। ক্রুদের খবর ক্রুরাই ভাল জানবে। এমনিতে চীফকুক বেশ ফূর্তিবাজ। পোর্টে পৌঁছুলে তার সাক্ষাৎ পাওয়া দুষ্কর। হাতের রান্নাও বলিহারি! বহুৎ কষ্টে গিলতে হয়।

সলিমদ্দি জানাল, কালরাতে চীফকুক গিয়েছিল ম্যাসাজ করাতে। মেয়েলি হাতের স্পর্শেই হোক আর ওদের চালাকিতেই হোক, ম্যাসেজ শেষে চীফকুক দেখে পকেট থেকে ১০০ ডলার উধাও। ম্যাসেজকারী দাবি করছে তার চার্জ। ডলার মেরে দেয়ার জন্যে চীফকুক ম্যাসেজকারী মেয়েটাকে অভিযুক্ত করে। কিন্তু কোনো লাভ হয় না। বরং এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে ম্যাসেজ ফি পরিশোধ না করা পর্যন্ত তার মুক্তি নেই। ওদেরই একজন পাশের পার্লার থেকে ডেকে আনে লস্করকে। লস্কর পরিশোধ করে ওদের পাওনা। এভাবেই উদ্ধার পায় চীফকুক। কথাটা জাহাজে জানাজানি হয়ে যাওয়ার পর ক্রুদের প্রধান আলোচনার বিষয় এখন ‘ম্যাসাজ’।

আজ বিকেলে পা বাড়াই অন্যপথে। কিছুদূর গিয়ে পেয়ে যাই একগাদা ক্যাসেট প্লেয়ার আর কম্প্যাক্ট ডিস্কের দোকান। গাদা গাদা সিডি, বেশিরভাগই ইংরেজি গান। ভিয়েতনামের হাইফঙেও এরকম অনেক সিডি দেখেছি। এখানে দাম বেশ শস্তা। সিডি প্রতি দাম ১ ডলার, মানে ৪০ টাকা। আমদের দেশে যার দাম কমপক্ষে দুশো টাকা। সিডি সম্পর্কে আমার ধারণা তেমন নেই। মোস্তফা বেশ আগ্রহী। সেই জানাল একথা।

জাহাজে ফিরে দেখি সবার মাঝে সাড়া পড়ে গেছে সিডির ব্যাপারে। ফোর্থ ইঞ্জিনিয়ার, থার্ড ইঞ্জিনিয়ার সবাই সিডি পাগল। ইতিমধ্যে একগাদা কিনেও ফেলেছে। সিডি প্লেয়ার আছে সেকেন্ড অফিসারের কাছে। অবসরে ওখানে বাজিয়ে দেখা হচ্ছে নতুন কেনা সিডি। সারা জাহাজে উৎসব উৎসব ভাব।

ডিউটিতে গেলে সলিমদ্দি পরামর্শ দেয়, স্যার, শ’খানেক সিডি কিন্যা লন। দ্যাশে বেঁচলে বহুৎ টাকা পাইবেন। কিন্তু তার পরামর্শ তেমন পছন্দ হয় না। তাদের সারাক্ষণের চিন্তা ওই একটাই। কোন পোর্ট থেকে কোন জিনিস কিনলে দেশে বেশি দামে বিক্রি করা যাবে।

কয়েকদিন কাটে ফ্যাঙচ্যাঙগ্যাঙ সিটিতে। শীতের কোনো কমতি নেই। আমাদের আবাসে রীতিমতো হিটিং চলছে। গরম পানি ব্যবহার করা হচ্ছে সব কাজে। যতক্ষণ ইঞ্জিনরুমে থাকি ততক্ষণ বেশ স্বাচ্ছন্দ বোধ করি। জাহাজ থেকে নামলেই শীত জাপটে ধরে প্রবল পরাক্রমে।

আজ আবার সেই সিডি দোকানে। মোস্তফাই টেনে নিয়ে যায়। সারারাতে পছন্দের শিল্পীদের এক দীর্ঘ তালিকা তৈরি করেছে ও। সেই তালিকা মতো সিডির সন্ধান করছি দোকানে দোকানে। এখানে একটা ওখানে দুটা এভাবে করে বেশ কয়েকটা সংগ্রহ করা গেল। এক দোকানে গিয়ে দেখা হরো আমাদের ক্যাপ্টেন আর চীফ ইঞ্জিনিয়ারের সাথে। তারাও এসেছেন সিডি কিনতে। আমাদের, মানে মোস্তফার, পরামর্শে তারা কিনলেন প্রায় তিরিশটা সিডি। চীফ ইঞ্জিনিয়ার আমাকে কিছু নিতে বললেন। দামটা উনিই দেবেন। আমি পছন্দ করলাম একটা ক্যাসেট – সং অব দ্য বার্ডস। আর একটা সিডি নিলাম বিটোফেন ও মোৎজার্টের কনসার্টের।

ফেরার পথে এক প্যাকেট চীনাবাদাম কিনি। প্যাকেটটা বেশ সুন্দর; আমাদের দেশের চিপসের প্যাকেটের মতো। মোস্তফা জানায়, আগামীকাল সকালে জাহাজ সাংহাইয়ের উদ্দেশ্যে রওনা করতে পারে।

জাহাজে এসে বাদামের প্যাকেট নিয়ে বসি সৌরভের সাথে। অপূর্ব স্বাদ তার। আসল চীনাবাদামের স্বাদ পেলাম আজ চীনে এসে। সৌরভ বলল, আরো দু’প্যাকেট নিলি না কেন? বললাম, আমি কি জানি চীনাবাদাম এত মজার হয়! কালকেই আরো কয়েক প্যাকেট নিয়ে আসব!

চীনাবাদামের নতুন কোনো প্যাকেট সংগ্রহের সুযোগ না দিয়েই খুব ভোরে ভেঁপু বাজিয়ে জাহাজ ছাড়ল। সৌরভ বলল, সাংহাই গিয়ে প্রথমেই কিনব চীনাবাদাম।

রহস্যপত্রিকা, জুলাই ১৯৯৭ সংখ্যায় প্রকাশিত

Series Navigation<< মিজোশিমা-কাকাগাওয়া

Leave a Reply

%d bloggers like this: