বড় হওয়ার সহজ উপায়

বাবাকে বাইরে যেতে হতো বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন কাজে। প্রায় প্রতিমাসে একবার জেলা সদর কিংবা বিভাগীয় সদরে যেতে হতো তাকে। বাবা শহরে গেলে আমরা অপেক্ষায় থাকতাম কবে আসবেন। প্রায় দিনই পথ চেয়ে থাকতাম। না, বাবা নূতন জামা-কাপড় বা খেলনা আনবেন সেজন্য না। বাবা ওসব আনতেন না। আনতেন মজার মজার সব বই। ওসব বই পেয়ে আমরা আনন্দে আটখানা হতাম। সাতরাজার ধন এনে দিলেও হয়তো ও রকম আনন্দিত হতাম না।

তখন পড়ি ক্লাশ থ্রিতে। বাবা গেছেন শহরে। অপেক্ষায় আছি কী বই আনেন তা দেখতে। দেখলাম বাবা দুটি বই এনেছেন। কোনো গল্প বা কবিতার বই না। পরিচিত কোনো লেখকেরও না।। বই দুটোর লেখক ডেল কার্নেগী। একটার নাম বড় যদি হতে চান, অপরটার নাম এখন মনে পড়ছে না। তবে সুখী ও আনন্দময় জীবন এধরনের কিছু একটা হবে। ওই বয়সে ওরকম বই পড়ে বুঝবার মতো ক্ষমতা আছে কি না সে নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। মনে হয় বাবার ইচ্ছে ছিল ছেলে-মেয়েরা অনেক বড় হবে। সেজন্যই বই দুটো কিনে দিয়েছিলেন।

বড় হওয়ার আকাঙ্ক্ষা আমারও ছিল। তাই দেরি করিনি। চটজলদি পড়তে শুরু করেছিলাম বড় যদি হতে চান । অমন বড় হওয়ার মহৌষধ হাতে পেয়ে কে না বড় হতে চায়? কিন্তু যে আগ্রহ নিয়ে বইটা পড়তে শুরু করেছিলাম কিছুক্ষণ পর সেই উৎসাহ আর রইল না। দেখলাম বড় হওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না, কারণ ডেল কার্নেগী সাহেবের বড় বড় উপদেশ পালন করা আমার পক্ষে প্রায় অসম্ভব।

না, তেমন কোনো আহামরি উপদেশ দেননি তিনি। বলেননি হিমালয় জয় করতে হবে কিংবা পাড়ি জমাতে হবে সমুদ্রে। প্রচুর বই পড়তে হবে, হতে হবে জ্ঞানী; জানতে হবে জগতকে এবং চিনতে হবে নিজেকে – এমন কথাও বলেননি। যা বলেছেন তা আমরা জানি। অনেকেই প্রয়োগ করি, এবং উঠে যাই উপরে। আর যারা পারি না তারা চিরদিনই নিচে রয়ে যাই, ফুটপাতে খালি পায়ে হাঁটি, অন্যের মোরগ চিবোনো দেখি, নিজে পান্তা ভাত খাই।

ব্যাপারটা আর কিছুই না, আপনাকে হতে হবে কৌশলী। ঝোঁপ বুঝে কোপ মারতে হবে। যেখানে স্বার্থসিদ্ধি হবে সেখানে আপনার কৌশল খাটাতে হবে। যেমন ধরুন আপনার কোনো বন্ধু, যার দ্বারা আপনি লাভবান হবেন; তার সঙ্গে কথা বলছেন। আপনাকে কৌশলী হতে হবে। কখনোই না বলতে পারবেন না, বিপক্ষে যেতে পারবেন না তার কথার। তিনি যদি বলেন – বাহ! আজকের দিনটা বেশ চমৎকার! আপনাকেও বলতে হবে, চমৎকার! বলতে পারবেন না, না – আজ ভ্যাপসা গরম, প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছে। যেমন করেই হোক তাকে খুশি রাখা চাই। সেজন্য তার প্রশংসা করা চাই। বলতে হবে, তোমার শার্টটা তো চমৎকার। কিংবা তুই আগের চেয়ে আরো সুন্দর হয়েছিস। শার্টটা যতোই বিশ্রি লাগুক আর গায়ের রঙ যতই কৃষ্ঞপক্ষের মতো কালো হোক না কেন তা বলা যাবে না। বললে ফেঁসে যাবেন। স্বার্থসিদ্ধি হবে না।

শুধু এতেই হবে না। আরো ব্যাপার আছে। আপনাকে হাসতে হবে। হ্যাঁ, হাসতে হবে; যতই কান্না আসুক না কেন। হাসিখুশি মানুষ সবার পছন্দ। ওরকম আরো নানা কৌশলের কথা বলেছেন ডেল কার্নেগী। ওসব কৌশলের সারমর্ম দাঁড়ায় একটাই – বাংলায় যাকে বলি চাটুকারিতা। আরো সোজা বাংলায় তৈল মর্দন বা তেল দেয়া!
হ্যাঁ, তেল দেয়াটাই আসল কাজ। যে যতো তেল দিতে পারবে সে ততো সিদ্ধি লাভ করবে। আসল বিদ্যা তৈল প্রদান। যে তৈল প্রদান শেখেনি তার উন্নতি নেই। চারপাশে তাকালে তার অজস্র প্রমাণ মেলে।

অনেক জায়গাতেই বিশেষ ব্যবস্থা থাকে। ঊর্ধতন কর্মকর্তা গোপন প্রতিবেদন পাঠাবেন অধস্তন কর্মকর্তা সম্পর্কে। সেই প্রতিবেদন নির্ধারণ করবে তার প্রমোশন হবে কি না। সুতরাং বড় হতে হলে কর্তাকে খুশি করতে হবে। খুশি রাখার একটাই উপায় তৈল প্রদান। তৈল প্রদানই উন্নতির চাবিকাঠি।

অনেকেই মানবেন না। বলবেন, তৈলপ্রদান বড় হওয়ার একমাত্র উপায় নয়। তা মানছি। একমাত্র উপায় নয় বটে, তবে বড় হওয়ার সহজ উপায় বৈকি!
আর যারা সততা আর সাহসের কথা বলে তারা ভুল বলে। হুমায়ূন আজাদের সেই প্রবচনকেই স্মরণ করতে হয়: মানুষ সিংহের প্রশংসা করে, আসলে সে পছন্দ করে গাধাকেই। গাধাকে দিয়ে ভার বহন করানো যায়, ভার বহনকারীকে কে না চায়? কে চাইবে সিংহের মুখের মধ্যে পড়তে? মুখে না পড়ুক – তার গর্জনই বা কদিন সহ্য করা যায়?

তাই তেল দিতে শিখুন: শিখুন কখন কীভাবে কী পরিমাণ তেল দিতে হবে। সেটাই সাফল্যের সহজ পথ।

Series Navigation<< তবুও সূর্য ওঠে

Leave a Reply

%d bloggers like this: