ভয়াল সেই রাতের কথা

২৯ এপ্রিল ১৯৯১।

রাতটার কথা মনে পড়তেই শিউরে উঠি। এত বছর পর আজও সে স্মৃতি জ্বলজ্বল করে চোখের সামনে।
তখন আমি মেরিন একাডেমির ক্যাডেট। মেরিন একাডেমি চট্টগ্রামের জুলদিয়ায়, চট্টগ্রাম এ‌য়ারপোর্টের উল্টোদিকে কর্নফুলি পেরুলেই টিলার উপর দেখা যাবে এটাকে। মনোরম পরিবেশ তার। পশ্চিমে কর্নফুলি, দক্ষিনে সমুদ্র। আমাদের ক্যাডেট ব্লক থেকে তাকালেই দেখা যায় সব। দূরে চট্টগ্রাম শহর, সমুদ্র, কর্নফুলি। সমুদ্রের বুকে নোঙর করে থাকা জাহাজগুলো নজরে পড়ে বেশি।

একাডেমির রুটিন বাঁধা জীবনে সেসব সৌন্দর্য উপভোগের সময় মেলে না। সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম। পিটি, প্যারেড, পড়াশুনা। ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র হিসেবে সারতে হয় ওয়ার্কশপ। অন্যান্যদিনের মতোই সেদিন ২৮ এপ্রিল কাটল রুটিনমতো। বিকেলে খেলাধুলা শেষে ফিরলাম ক্যাডেট ব্লকে। পত্রিকা দেখার সুযোগ তেমন একটা মিলত না। রেডিও বা টিভির খবর শোনাও হতো না। তাই আবহাওয়ার পূর্বাভাস সম্পর্কে সবাই ছিলাম অজ্ঞ। সেদিন রাতের বেলা ইন্সট্রাকশন ব্লক থেকে ফেরার সময় ক্যাডেট ক্যাপ্টেন বললেন, তোমরা সবাই দরজা-জানালা ভালো করে বন্ধ করে দাও। ব্যস, সেই কথামতো কাজ। রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষে রীতিমতো পরিদর্শন রাউন্ড ও ঘুমুনোর নির্দেশ। লাইটস আউট, পাইপ ডাউন। সারাদিনের ক্লান্তির পর আরামের ঘুম।
শেষ রাতের দিকে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। বাইরে ঝড়ের শব্দ। চুপ করে থাকলাম। চোখ মেলে পাশে তাকালাম। সহপাঠীরা সবাই ঘুমুচ্ছে। পরে জেনেছি ওরাও আমার মতোই চোখ বন্ধ করে ছিল। কেউ কেউ ভেবেছিল, যাক সকালের পিটি থেকে বাঁচা গেল। ঝড়-বৃষ্টির দিনে সাধারণত পিটি হতো না। তাই ভাবনাটা আমার মনের মধ্যেও এসেছিল।

ভোরের বাঁশি বাজার অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু সারাশব্দ নেই। বাইরে একটা কিছু ঘটছে বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু কী ঘটছে তা বুঝতে পারছি না। ভোর হয়ে আসছে এটা বুঝতে পারছি। শরীরই জানান দিচ্ছে সেটা। কিন্তু একি, মসজিদে আজান নেই। রিভিলি পাইপ নেই। আমাদের ক্যাডেট ক্যাপ্টেনেরও সাড়াশব্দ নেই। তিনি প্রতিদিন সবার আগে ওঠেন। জাগিয়ে দেন এ ডরমিটরির সবাইকে। জাগুয়ার্স, গেটআপ – ডাক শুনেই ঘুম ভাঙে আমাদের। পাইপ দিচ্ছেনা দেখে চুপ করে থাকি। কিন্তু বাইরে সূর্যের আলো দেখা যাচ্ছে। বিছানায় শুয়ে সূর্যের আলো দেখা এখানে এই প্রথম। উঠে পড়ি একে একে। বাইরে বেরিয়ে দেখি সামনের মাঠে ঝড়ের চিহ্ন। ভাঙা ডালপালা। কিন্তু তখনও বুঝিনি কত প্র্রচন্ড তান্ডবলীলা চালিয়েছে এ ঝড়।

শরীরচর্চা প্রশিক্ষক বা পিটিআই-এর বাঁশির শব্দ শুনতে পাই নিচে। অন্যদিনে মতো পিটি’র পোশাক পরে দৌড়ে নিচে নামি। ভাবতে থাকি আজকে এই দেরিটা করার জন্য কি পানিশমেন্টই না অপেক্ষা করছে। দৌড়ে নিচে নামতেই নজরে পড়ল ঝড়ের চিহ্ন গোটা মাঠে। পিটিআই জানালেন আজ আর পিটি হবে না। ক্যাডেট ক্যাপ্টেনকে বললেন, সবাই নাস্তার পর জমায়েত হবে। ইতোমধ্যে নাস্তার সময় হয়ে গেছে। কিন্তু নাস্তা তখনও প্রস্তুত হয়নি। এর আগে কখনও এমনটি ঘটেনি। আমরা সকালে উঠে নামাজ পড়ে পিটি করতে যাই, এসে গোসল সেরে ডাইনিঙে গিয়ে নাশতা রেডি পাই। সবাই একসাথে খেয়ে দৌড় দিই প্যারেড গ্রাউন্ডে। এটাই ঘটে আসছে। আজকেই ব্যতিক্রম, নাশতা নেই। চুলা জ্বলেনি।

বেশ কিছুক্ষণ দেরি করার পর আমরা নাশতা পেলাম। তবে আজ সব এলোমেলো। নাশতার পরই মেরি আইল্যান্ডের সামনে জমায়েত হলাম সবাই। কিছুক্ষণ পর ক্যাপ্টেন লোহানী এবং আমাদের গানারি ইন্সট্রাক্টর (জিআই) এলেন। আমাদের জানানো হলো এক ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় বয়ে গেছে রাতে। চট্টগ্রাম শহরসহ আশেপাশের উপকূলবর্তী এলাকায় প্রচন্ড তান্ডবলীলা হয়ে গেছে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনও জানা যায়নি। ক্যাপ্টেন লোহানী জানালেন, আমাদের একাডেমি জেটিতে বাঁধা দুটি বোট উধাও হয়েছে। আমাদের যেতে হবে সে দুটি বোট উদ্ধারে। জুনিয়র ও সিনিয়র ক্যাডেটদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে বাছাই করে গড়ে তোলা হলো বোট রেসকিউ পার্টি। আমিও পড়লাম সেই দলে। বাকি ক্যাডেটদের বিভক্ত করা হলো কয়েকটি ছোট দলে। তাদেরকে একাডেমির মধ্যেই বিভিন্ন কাজ করতে হবে।

একটু পরই আমাদের বোট রেসকিউ পার্টি যাত্রা শুরু করল। একাডেমি গেট পেরিয়েই আমরা থ। একাডেমি গেটের সামনে আছে আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং ও নটিক্যাল ওয়ার্কশপ। গেট পেরুলে কয়েক গজ পরই কর্নফুলির তীর। সেখান থেকে লম্বা ব্রিজ চলে গেছে বোট ঘাটে। এরই উত্তর দিকে একটি বিশাল জাহাজ এসে তীরে আটকে গেছে। কেউই কল্পনা করতে পারবেনা সমুদ্রগামী একটি আস্ত জাহাজ কখনও এখানে এসে তীরে আটকে যেতে পারে। পরে জানা গেল জাহাজটি কর্নফুলির মোহনায় নোঙর করে ছিল। ঝড়ের সময় সেটি আছড়ে চলে এসেছে এখানে এবং এই তীরে আটকে গেছে।

আমাদের বোট ঘাটে তখন একটা বোট ছিল। সেটা বেঁচে গেছে রাতের বেলা অন্যত্র থাকা‌য়, অন্যত্র মানে এয়ারপোর্টে যাওয়ার রাস্তার পাশে যে জেটি আছে সেখানে। সেই বোটে চড়ে আমরা রওনা দিলাম। বোট চলল উজানে। তখনও আমরা জানিনা আমাদের সেদিনের অভিজ্ঞতা আরো ভয়ঙ্কর হবে। আমরা যতই উজানে যাই ততই বিস্মিত হই। কর্নফুলির পানিতে ভেসে আসছে সবকিছু। কারো বাড়ির চাল, হাড়ি পাতিল – গবাদি পশুর লাশ! একটু পরই কে যেন চিৎকার করে উঠল। সবাই তাকালাম সেদিকে। পানিতে ভেসে যাচ্ছে মানুষের লাশ! পেট ফুলে উঠেছে পানি ঢুকে। মানুষের লাশের সাথে সাথে আরো অনেক কিছু ভেসে আসতে দেখলাম। গরু, ছাগল, ঘরের চাল। আরো কত কিছু যে ভেসে যাচ্ছে কর্নফুলি ধরে। সবটাই গিয়ে হয়ত বঙ্গোপসাগরে পড়বে। সেসব দেখে আমাদের রেসকিউ পার্টির অনেকেই ভয় পেতে শুরু করল। কেউ কেউ ভাবল এই রেসকিউ পার্টির অন্তর্ভুক্ত না হলেই বেঁচে যেতাম। আমাদের সিনিয়র এক স্যার বললেন, ওদিকে তাকিও না কেউ। আর তাই আমরা চোখ বন্ধ করে সেদিকে তাকানোর বিকল্প হিসেবে নিজেদের মধ্যে গল্প শুরু করলাম।

আমাদের বোট উজানে এগিয়ে একটু পর আমরা পতেঙ্গা বিমান বন্দরের নিকট অবস্থিত মেরিন একাডেমির জেটির কাছে গেলাম। জেটির কিছু অংশ ভেঙে গেছে। সেখানে করার মতো কিছুই ছিল না। তাই একাডেমির জেটি ছেড়ে আরো সামনে এগুলাম‌।

একাডেমির জেটি পেরিয়ে আরেকটু এগিয়ে গিয়ে আমরা আমাদের হারানো বোটের সন্ধান পেলাম। সেটি তখন কর্নফুলির পূর্ব পাড়ে একটি বাড়ির চালে আটকে আছে। আসলে সেটি কর্নফুলির তীর থেকে বেশ কিছু দূরে। একটু পুকুর। তার পাড়ে অনেকগুলো নারকেল গাছ। তারই একধারে কয়েকটি কুটীর। এরকম একটি কুটীরের উপরই আছড়ে পড়েছে আমাদের বোট।

ক্যাপ্টেন লোহানী কী যেন আলাপ করলেন সারেঙের সাথে। তারপর ধীরে ধীরে আমাদের বোট সেদিকে ঘুরতে লাগল। কিছুদূর যাওয়ার পর আর এগুনো সম্ভব হলো না। তখন আমরা একে একে পানিতে নামতে লাগলাম। পানির পরিমাণ সেখানে অল্পই। হেঁটে সহজেই সবাই তীরে পৌঁছাতে পারলাম।

সেখান থেকে হেঁটে বেশ কিছুদূর গেলে আমাদের বোট। বোটের চারপাশে আমরা জমায়েত হলাম। আশে পাশের কুটিরগুলিতে কোনো মানুষের চিহ্ন নেই। সেই বোটকে আমরা এখন পানিতে নামিয়ে আনার চেষ্টা করলাম। বিভিন্ন রশি দিয়ে প্রথমে বোটটাকে বাঁধা হলো। তারপর বিভিন্ন জন বিভিন্ন দিকে ধরে টানাটানি। আমাদের গাইড করছেন ক্যাপ্টেন লোহানী। আমরা কোনোদিন ক্যাপ্টেন লোহানীর এত কাছে আসতে পারিনি। দূরত্ব বজায় রেখেই তাঁর সাথে কথা বলতে হয়েছে, সমীহ করে চলতে হয়েছে। এখন এত কাছে আমরা তাঁরই নির্দেশনায় বোটটাকে টেনে পানিতে নামানোর চেষ্টা করছি।

বেশ কিছুক্ষণ টানাটানি করার পরও সেটা নামানো গেল না। আশেপাশে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাউকে পাওয়া যায় কি না সেই খোঁজে দুজনকে পাঠানো হলো। তারা হয়ত সাাহায্য করতে পারবে। আবার নতুন পরিকল্পনা নিয়ে এগুতে হলো। এবারে দুই দলে একই দিকে টানবে। একটু পর বোটটা একটু নড়ল। মাটিতে লেগে থাকায় সহজে সরানো যাচ্ছিল না। একটু আগে লোক খুঁজতে যাওয়া দুজন ফিরে এল। সাথে এক লোককে নিয়ে এলো। তার কাছে এখন কিছুই নেই। হাতে একটা দা নিয়ে এসেছে। তাদের বাড়িঘর ভেঙে গেছে। কিছুটা উড়ে গেছে, কিছুটা বিধ্বস্ত। সেটাই ঠিক করছিল সে। লোকটা আমাদের দেখে, ক্যাপ্টেন লোহানীর সাথে কথা বলে বেশ সমীহ করতে শুরু করল।

ডাব পেড়ে দিই স্যার? খান। লোকটা বলল।

আমরা না করলেও লোকটা হুট করে গাছে উঠে বসল। তারপর কয়েকটা ডাব পাড়ল। আমাদের কেউ কেউ সেই ডাবের পানি খেলাম। ডাবের পানি খেয়েই হোক কিংবা অন্য কোনোভাবে শক্তি সঞ্চয়ের কারণেই হোক- আমরা অবশেষে বোটটা পুরোই পানিতে নামিয়ে আনতে পারলাম। এক সারেঙকে দায়িত্ব দেয়া হলো সেটা নিয়ে জেটিতে ফেরার জন্য।

আরেকটা বোটের সন্ধান আমরা তখনই পাইনি। এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করে বোট নিয়ে সবাই একাডেমিতে ফিরে এলাম। তখন দুপুর হয়ে গেছে। এসে দেখি অন্যান্য সহপাঠীরা ক্যাম্পাস পরিষ্কার করায় ব্যস্ত। আমাদের আসতে দেখে অনেকেই জানতে চাইল কী করলাম। আমাদের কেউ কেউ রসিয়ে রসিয়ে অ্যাডভেঞ্চারের কথা বলতে লাগল। সবার মুখে মুখে চাউর হয়ে গেল আমরা ক্যাপ্টেন লোহানীর নেতৃত্বে ডাব খেতে গিয়েছিলাম। রেসকিউ পার্টির অংশ হতে না পারায় কেউ কেউ আফসোস করল। কিন্তু আমরা যারা সেদিন নদীতে মৃত গরু-ছাগলের সাথে মানুষের লাশ ভেসে যেতে দেখেছিলাম তারাই জানি সেটা কতটা বেদনা দায়ক ছিল।

 

সকাল থেকেই বিদ্যুত নেই। দুপুরে নামাজ পড়ে গেলাম কোনো ক্রমে। বিদ্যুত না থাকায় এরই মধ্যে পানির সাপ্লাই বন্ধ হয়ে গেছে। তাই গোসল করার জন্য একাডেমির লেকে গেলাম। সেখানে গিয়ে আনন্দেই গোসল করলাম কয়েকজন। আনন্দ এজন্য যে আজ আমরা এই লেকে আসার সুযোগ পেয়েছি। ক্যাডেটদের জন্য এই লেকে আসা নিষিদ্ধ। জুনি‌য়র ক্যাডেটদের জন্য আরো। কোনোদিন সেই লেকে নেমে গোসল করব সেটা কল্পনাও করিনি। মসজিদে নামাজ পড়তে গেলে তখন কমান্ড্যান্ট জানালেন সবাইকে প্রস্তুত থাকতে, আমাদের ছুটি দিয়ে দেয়া হতে পারে। বিকেলের দিকে কেউ কেউ জানাল তাদের পেটের সমস্যা শুরু হয়েছে, ডায়রিয়ায় ভুগছে কেউ। রেসকিউ পার্টিতে গিয়ে ডাব খাওয়ার কারণে সেটা ঘটছে কি না সেই প্রশ্নও তুলল কেউ কেউ।

সন্ধ্যায় পুরো একাডেমি অন্ধকার। বিদ্যুত নেই। এরই মধ্যে বিকেলে কেউ শহরে গিয়েছিল। সেখান থেকে বেশ কিছু মোমবাতি নিয়ে এসেছে। আবার আগে থেকেও কারো কাছে মোমবাতি ছিল। শহরে মোমবাতি আর খাবার পানির সংকট চলছে। রাতে ডিনারের আগেই ঘোষনা এল আমাদের ছুটি‌, দুসপ্তাহের জন্য। সকালে উঠেই সবাই যার যার গন্তব্যে চলে যাবে। আমরা সবাই দৌড়ে নিজেদের লাগেজ গুছিয়ে নিলাম।

পরদিন সকালে উঠে আমরা চট্টগ্রাম শহরে এলাম। কোনোক্রমে ঢাকা ফেরার বাস পেলাম। পুরো চট্টগ্রাম শহর তখন এক ভুতুড়ে শহর। ঢাকায় এসে টিভিতে আর পত্রিকায় খবর দেখে আৎকে উঠলাম। হায় আল্লাহ, এত বড় একটা ঘুর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাস হয়ে গেল – আর আমরা এত কাছে থেকেও তেমন কিছু বুঝতে পারলাম না। তখন বুঝলাম, সেদিন একাডেমির মসজিদে নামাজ পড়ার সময় কেন শোকরানা মোনাজাত করা হচ্ছিল। কমান্ড্যান্ট বলছিলেন, আমাদের একাডেমি সমুদ্রের এত কাছে থেকেও কীভাবে যেন রক্ষা পেয়ে গেছে। ক্ষয়ক্ষতি তেমন হয়নি।

তারপর কয়েকদিন পত্রিকা দেখি, প্রতিদিন লাশের সংখ্যা বাড়ে। আর আমার চোখের সামনে ভাসতে থাকে কর্নফুলিতে ভেসে যাওয়া গরু, ছাগল আর মানুষের লাশ।

Leave a Reply

%d bloggers like this: