ম্যানেজার ও কর্মীর পারফরম্যান্স

১.

আপনি একজন ম্যানেজার। আপনার অধীনে কয়েকজন কর্মচারী আছে – তাদের দিয়ে কাজ করে নেয়ার দায়িত্ব আপনার। হতে পারে তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে আপনি কোনো ভূমিকা রেখেছেন, আপনার পছন্দমতো লোক নিয়োগের সুযোগ আপনি পেয়েছেন। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আপনি এটি পারবেন না, আপনি একদল কর্মী পাবেন যারা আগে থেকেই আছে। তাদের নিয়েই আপনাকে কাজ করতে হবে। এখন কাজ করতে গিয়ে আপনি যদি দেখেন কেউ কাজ করছে না বা করতে পারছে না, তাহলে কী করবেন? সে যে কাজ করছে না বা করতে পারছে না তার দায়িত্ব কার?

অনেক ম্যানেজারকে দেখি কাজ করা কিংবা করতে না পারার দায়ভার সেই কর্মীর উপর চাপিয়ে দিয়ে নিজে মুক্ত হতে চায়। ম্যানেজমেন্ট গুরু পিটার এফ ড্রাকার বলেছেন, ‘কর্মীর পারফরম্যান্সের দায়িত্ব ম্যানেজারের।‘ কর্মী কাজ করছে না কিংবা করতে পারছে না এই বলে দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। কর্মীদের দিয়ে কাজ করিয়ে নেয়াই ম্যানেজারের কাজ। কিন্তু এটি করবেন কীভাবে?

২.

প্রায় প্রতিটি সংস্থায় কর্মীদের পারফরম্যান্স মূল্যায়ণের ব্যবস্থা থাকে, আর নির্দিষ্ট সময় অন্তর এই কাজটি করতে হয় ম্যানেজারদেরকেই। ম্যানেজাররা তখন তাদের অধীনস্থদের পারফরম্যান্সের হিসেব কষেন; সবক্ষেত্রেই যে হিসেব সঠিক হয় তাও ঠিক না। তবে ধরুন কারো পারফরম্যান্সের হিসেব কষে দেখলেন খুবই খারাপ অবস্থা। এখন কী করবেন? ছাঁটাই? অনেকক্ষেত্রেই সেটা একটা পন্থা হতে পারে; তবে সমস্যাও থাকে তাতে। হয়ত দেখা যাবে সেই লোক ওই একই সংস্থায় কাজ করেছে দীর্ঘদিন এবং বেশ ভালভাবেই কাজ করে এসেছে। এমনও হতে পারে যে সে কাজ করতে পারছে না কেবল বর্তমান ম্যানেজারের অধীনে। তাই পারফরম্যান্স খারাপ হলে প্রথম কাজ হলো বের করা কেন এটি ঘটছে।

পারফরম্যান্স মাপার একটা সহজ সূত্র আছে, এটি বুঝলে অনেক সহজ হয়ে যাবে ব্যবস্থা নেয়া। সূত্রটি হলো:

পারফরম্যান্স = সক্ষমতা x দায়িত্ব সম্পর্কে স্বচ্ছতা x প্রণোদনা/প্রেরণা

প্রথমে দেখুন যে কাজের জন্য সেই লোককে নিয়োগ করেছেন সে সেটি করার উপযুক্ত কি না। সেই কাজ করার দক্ষতা তার আছে কি না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখতে পাবেন যে সেই দক্ষতা ওই কর্মীর মধ্যে আছে। যদি সেই দক্ষতা না থাকে তাহলে তাকে সেই কাজের দক্ষ হিসেবে গড়ার জন্য ম্যানেজারকে ব্যবস্থা নিতে হবে। তাকে আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণে পাঠানো যেতে পারে, অন্যদের কাছ থেকে শেখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে, কিংবা ম্যানেজার নিজেই তাকে শেখানোর চেষ্টা করতে পারে।

সেই কর্মীর কাছ থেকে ঠিক কী চান সে সম্পর্কে স্বচ্ছতাা থাকতে হবে। সে যদি তার ভূমিকা সম্পর্কে ধোঁয়াশার মধ্যে থাকে তাহলে ভাল পারফরম্যান্স আশা করতে পারেন না। আবার তার কাছ থেকে আগে যা আশা করেন নি, কিংবা তাকে করতে বলেননি সেটিকে আপনি পারফরম্যান্স মূল্যায়ণে বিবেচনায় আনতে পারেন না; আনা উচিৎ নয়। তাই কোনো কর্মীর কাছ থেকে আপনার প্রত্যাশা কি সেটি প্রথমেই খোলাসা করুন, তারপর বিভিন্ন সময় তা স্মরণ করিয়ে দিতে থাকুন। তাহলে সেই কর্মীর পক্ষেও সহজ হবে লক্ষ্যে স্থির থাকা।

একইরকম গুরুত্বপূর্ণ হলো কর্মীর মোটিভেশন, প্রণোদনা বা প্রেরণা। সে ওই কাজ কেন করবে সে ব্যাপারে তার যথেষ্ঠ উৎসাহ-উদ্দীপনা থাকতে হবে। শুধু বেতন পেলেই যে কর্মীরা উদ্বুদ্ধ থাকে তা নয়; বিভিন্ন কারণে তাদের উৎসাহ-উদ্দীপনায় ভাটা পড়তে পারে। কর্মীকে উদ্দীপিত রাখাও ম্যানেজারের কাজ। এই কাজটি করার অনেক উপায় আছে; এ সম্পর্কে অনেক মতবাদ আছে, কৌশল আছে। সেসব সম্পর্কে পরে বিস্তারিত আলোচনার ইচ্ছা রইল।

পারফরম্যান্সের সূত্রটি আরেকবার লক্ষ্য করুন; এখানে সক্ষমতা, দায়িত্ব সম্পর্কে স্পষ্টতা এবং প্রণোদনা বা প্রেরণা কোনোটিই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এর কোনো একটি শূণ্য হলে পারফরম্যান্স শূণ্য। তাই ম্যানেজার হিসেবে আপনার দায়িত্ব হবে এই তিনটিকেই সর্বোচ্চ পর্যায়ে রাখা।

৩.
বিভিন্ন সংস্থায় পারফরম্যান্স মূল্যায়ণের ক্ষেত্রে সাধারণত একটি সময় বেঁধে দেয়া থাকে; তিনমাস, ছয়মাস কিংবা এক বছর পর এই মূল্যায়ণ হয়ে তাকে। তবে এখনকার দিনে এই ধারণা থেকে একটু দূরে সরে আসতে হবে – গৎবাঁধা পারফরম্যান্স মূল্যায়ণের বদলে ক্রমাগত পারফরম্যান্স ব্যবস্থাপনার দিকে যেতে হবে। ম্যানেজারের দায়িত্ব হবে কর্মীদের প্রাত্যহিক পারফরম্যান্সের দিকে নজর দেয়া এবং তাৎক্ষণিকভাবে পারফরম্যান্সের অবনতির কারণ বের করে আনা ও যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া। তাহলে সেই সংস্থার হারানোর কিছু থাকে না। সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড় বলে যে কথাটা প্রচলিত আছে সেটি মনে রাখতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব পারফরম্যান্সকে কাঙ্ক্ষিত মানে নিয়ে আসতে পারলেই আপনি সফল হবেন, আপনার সংস্থা উপকৃত হবে।

৪.
ম্যানেজার হিসেবে আপনাকে মনে রাখতে হবে যে আপনি নিজে কী করলেন সেটিতেই আপনার পারফরম্যান্স মাপা যাবে না; আপনার আসল পারফরম্যান্স আপনার পুরো টীম কী করছে তার উপর নির্ভর করবে। তাই পুরো টীমের পারফরম্যান্স ঠিক রাখুন – গৎবাঁধা মূল্যায়ণের দিকে না গিয়ে ক্রমাগত সেই পারফরম্যান্স ম্যানেজ করুন। আপনি সফল হবেন।

Series Navigationকোন কাঁটা – ঘড়ি নাকি কম্পাস? >>

3 comments on “ম্যানেজার ও কর্মীর পারফরম্যান্স”

  1. Abdul Kaium বলেছেন:

    অনেক ভালো লাগলো….. আরো পাবো আশা করি…..

    1. সুহৃদ সরকার বলেছেন:

      আপনার মতামতের জন্য ধন্যবাদ। আশা করি আরো কিছু লিখতে পারব। সাথে থাকবেন। 🙂

  2. Prince Tanvir বলেছেন:

    আমি একটি ট্রান্সপোট এর নতুন ম্যানেজার আমাকে কিছু উপদেশ দিলে আপনার প্রতি কৃতঙ্গ হতাম……..

Leave a Reply

%d bloggers like this: