শুরুর কথা

বেঁচে থাকার জন্য এখনই সর্বোত্তম সময়! আপনার জীবনের লক্ষ্য অর্জনের জন্য এত সুযোগ ও সম্ভাবনা এর আগে কখনও ছিল না। মানবসভ্যতার ইতিহাসে যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন আপনার নিকট অনেক বিকল্প পথ রয়েছে। মূলত এখন আপনি বিকল্পের সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছেন, কোনটি ছেড়ে কোনটি নেবেন বুঝতে পারছেন না। বস্তুত এখন অনেক ভাল কিছু করার আছে যার মধ্য থেকে একটি বেছে নেয়া সত্যিই বেশ কঠিন। আপনার জীবনে সাফল্য লাভের সূত্রপাত এই সঠিক কাজটি বেছে নেয়ার মাধ্যমে।

আপনি যদি আজকের বেশিরভাগ লোকের মতোই হোন তাহলে অতি অল্প সময়ে অনেক কাজ শেষ করার ভারে আপনি ভারাক্রান্ত। অনেক পরিশ্রম করে একটি কাজ শেষ করতে না করতেই আরো পাঁচটি নূতন কাজ এসে হাজির হচ্ছে। এর কারণে আপনার ডেস্কে কাজের স্তুপ জমছে। আপনি সেই স্তুপ দেখে ক্রমশই হতাশ হচ্ছেন। আসলে আপনার কাজের মধ্যে সব কাজ আপনি কখনই শেষ করতে পারবেন না। আপনি কখনই পুরনো সব কাজ শেষ করতে পারবেন না। আপনি যতই কাজ করুন না কেন আপনার কাজের স্তুপ জমতেই থাকবে। আপনি আপনার সকল দায়িত্ব ও কর্তব্য কখনই শেষ করতে পারবেন না।

এই কারণে, এবং অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে এটি এখন বেশি দরকার, প্রতি মুহূর্তে আপনার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং সেই অনুসারে কাজটি দ্রুত ও ভালভাবে সমাপ্ত করা খুবই জরূরী। এই সক্ষমতাই আপনাকে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে পারে।

অগ্রাধিকার নির্ণয় ও সেই অনুসারে সেসব কাজ দ্রুত সমাপ্ত করার মাধ্যমে খুবই সাধারণ ব্যক্তিও অনেক প্রতিভাবান ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে যেতে পারে, বিশেষ করে যেসব প্রতিভাবান ব্যক্তি অনেক সুন্দর পরিকল্পনার কথা বলে কিন্তু সেগুলিকে বাস্তবায়ন করে না।

অনেক দিন যাবৎ কর্মক্ষেত্রে একটি কথা প্রচলিত আছে। বলা হয় যে, প্রতিদিন সকালে আপনার প্রধান করণীয় হলো একটি জ্যান্ত ব্যাঙ খাওয়া। একবার একটি জ্যান্ত ব্যাঙ খেলে আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন যে এর চেয়ে কঠিন কিংবা অপ্রীতিকর কিছু সারাদিনে আপনাকে আর করতে হবে না।

এই ‘ব্যাঙ’ হলো আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সবচেয়ে বড় কাজ যেটিতে আপনার কালক্ষেপণ করার সম্ভাবনা আছে। আপনি যদি সেই কাজটি এখনই না করেন তাহলে সেটি করতে হয়ত অনেক সময় লেগে যাবে। এটি এমন এক কাজ যা শেষ করলে আপনার দায়িত্বের বেশিরভাগই করা হয়ে যাবে। এটি আপনার জীবন ও পেশার উপর সুপ্রভাব ফেলবে সবচেয়ে বেশি।

আরো বলা হয় যে, ‘আপনার সামনে যদি দুটি ব্যাঙ থাকে তাহলে সবচেয়ে কুৎসিতটি আগে খান।’

এর অর্থ হলো আপনার হাতে যদি দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকে তাহলে সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি আগে করুন। যেকোনো কাজ সাথে সাথে শুরু ও খুব দ্রুত শেষ করার জন্য নিজেকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করুন। কোনো কাজ শুরু করার পর সেটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেটিতে লেগে থাকুন। সেই কাজটি সম্পূর্ণ শেষ হলে তবেই অন্য কোনো কাজে হাত দিন।

মনে করুন এটি আপনার পরীক্ষা। পরীক্ষার হলে যেমন সব প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে অন্য কিছু করতে পারেন না তেমনি ধরুন আপনি যে কাজটি শুরু করেছেন সেটি শেষ না করা পর্যন্ত আপনি কিছু করতে পারবেন না। নিজেকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিন। কখনও ছোট কাজ আগে শেষ করার প্রলোভনে পড়বেন না। প্রতিক্ষণ নিজেকে মনে করিয়ে দিন প্রতিদিন সকালে আপনি কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এবং সেটি কীভাবে করছেন।

আরেকটি লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো: “আপনাকে যদি একটি জীবন্ত ব্যাঙ খেতেই হয় তাহলে বসে বসে সেটির দিকে তাকিয়ে থেকে লাভ কী? যত দ্রুত সম্ভব সেটি খেয়ে ফেলুন।”

পারফরম্যান্সের উচ্চ স্তরে পৌঁছার জন্য আপনাকে প্রতিদিন সকালে এসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি প্রথমে শেষ করার আজীবন অভ্যেস গড়ে তুলতে হবে। আপনাকে অবশ্যই অন্য কিছু করার আগে খুবই কম সময়ে ব্যাঙ খাওয়ার অভ্যেস গড়ে তুলতে হবে।

কর্মক্ষেত্রে দ্রুত উন্নতি করে এমন মানুষদের উপর বিভিন্ন গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে যে, যে প্রধান গুণের কারণে তারা কর্মক্ষেত্রে উন্নতি করেছে তাহলো কাজের প্রতি অনুরাগ। তারা সবাই কাজ করতে ভালবাসেন, কাজ থেকে তাদের সরিয়ে রাখা যায় না। সফল ও কার্যকর ব্যক্তিরা সরাসরি তাদের প্রধান কাজে মনোনিবেশ করেন এবং এরপর সেই কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিজেকে তাতে নিয়োজিত রাখেন।

আমাদের এই জগতে, বিশেষ করে ব্যবসার জগতে, আপনাকে বেতন দিয়ে রাখা হয় বিশেষ কিছু ফল লাভের জন্য। আপনি সেই প্রতিষ্ঠানের জন্য কিছু কাজ করে সেই প্রতিষ্ঠানের মঙ্গলের জন্য অবদান রাখবেন সেজন্যই আপনাকে বেতন দেয়া হয়। আপনার অবদান কী হবে আপনাকে নিয়োগ দেয়ার সময়ই বলে দেয়া হয়।
আজকের দিনে প্রতিষ্ঠানসমূহের মূল সমস্যা হলো কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থতা। অনেক লোকই অর্জন ও কাজের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। তারা ক্রমাগত কথা বলে, মিটিং করে, চমৎকার পরিকল্পনা করে, কিন্তু শেষ বিশ্লেষণে দেখা যায় কাজের মাধ্যমে সঠিক ফল আনা সম্ভব হয়নি।

আপনার জীবনে ও কর্মক্ষেত্রের শতকরা ৯৫ ভাগ অর্জন নির্ধারিত হবে আপনি কোন ধরনের অভ্যেস গড়ে তুলছেন তার মাধ্যমে। অগ্রাধিকার নির্ধারণ, কালক্ষেপণ এড়ানো, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ আগে শেষ করার অভ্যেস হলো আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক ও শারীরিক দক্ষতা। বারবার করা এবং অনুশীলনের মাধ্যমে এই অভ্যেস আপনি নিজের আওতায় আনতে পারেন। একই কাজ বারবার করার মাধ্যমে সেটি আপনার অবচেতন মনে গেঁথে যাবে এবং অভ্যেসে পরিণত হবে। একবার এটি অভ্যেসে পরিণত হওয়ার পর আপনা থেকেই সেই কাজ হবে এবং সেটি করা অনেক সহজ হবে।

আপনাকে মানসিক ও আবেগগতভাবে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে কোনো কাজ শেষ করে আপনি ভাল অনুভব করেন। কোনো কাজ শেষ করলে আপনার নিজেকে সুখী মনে হয়। এর ফলে আপনি নিজেকে বিজয়ী ভাবতে পারেন।

আপনি যখনই কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ করেন তখন আপনার মধ্যে কর্মশক্তি, আগ্রহ ও আত্ম-সম্মানবোধের এক জোয়ার তৈরি হয়। আপনার শেষ করা কাজটি যত গুরুত্বপূর্ণ হবে আপনি নিজেকে তত আত্মবিশ্বাসী, শক্তিশালী ও সুখী ভাবতে পারবেন।

কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ সমাপন করা হলে আপনার মস্তিষ্কে এন্ড্রোফিনের নি:সরণ ঘটে। এই এন্ড্রোফিন স্বভাবতই আপনাকে কাজে তুঙ্গে রাখে। গুরুত্বপূর্ণ কাজের সমাপ্তি আপনার মধ্যে যে এন্ড্রোফিনের প্রবাহ চালু করে তা আপনাকে আরো সৃজনশীল ও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।

এখন সাফল্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ রহস্য বলা হবে। আপনি নিজেই এন্ড্রোফিনের প্রতি এক ধরনের সু-আসক্তি গড়ে তুলতে পারেন যা আপনাকে ক্রমাগত স্বচ্ছ, আত্মবিশ্বাসী এবং সামর্থ্যবান ভাবতে সাহায্য করবে। এই সু-আসক্তি তৈরি করলে আপনি বিশেষ কোনো চেষ্টা ছাড়াই ক্রমাগত অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরু ও শেষ করতে থাকবেন। আপনি তখন গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ করার মাধ্যমে সাফল্য লাভ ও অবদান রাখার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েন।

একটি চমৎকার জীবন যাপন করা, একটি সফল পেশা গড়া, এবং নিজেকে চমৎকার বোধ করার চাবিকাঠি হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজসমূহ শুরু ও শেষ করার অভ্যেস। অভ্যেসে পরিণত হলে এটি নিজেই একটি শক্তিতে পরিণত হবে যা আপনার গুরুত্বপূর্ণ কাজসমূহ দ্রুত সমাপন করতে সাহায্য করবে।

আপনার নিশ্চয় সেই সঙ্গীতজ্ঞের গল্পের কথা মনে আছে নিউ ইয়র্কের রাস্তায় যাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কোনপথে কার্নেগি হলে যাওয়া যাবে? জবাবে সে বলেছিল, ‘অনুশীলন করো, বাছা, অনুশীলন করো!’

অনুশীলন হলো যেকোনো বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের মূল। সৌভাগ্যবশত, আপনার মন মাংসপেশীর মতোই। আপনি যত বেশি ব্যবহার করবেন এটি তত সবল ও সামর্থ্যবান হবে। অনুশীলনের মাধ্যমে আপনি আকাঙ্ক্ষিত বা প্রয়োজনীয় যেকোনো আচরণ শিখতে কিংবা অভ্যেস গড়ে তুলতে পারেন।

কোনো একটি বিষয়ে একাগ্রচিত্তে মনোনিবেশের অভ্যেস গড়ার জন্য আপনার তিনটি গুণ দরকার, যার সবকটিই শিখতে পারেন। এগুলি হলো: সিদ্ধান্ত, শৃঙ্খলা এবং দৃঢ় প্রতিজ্ঞা।

প্রথমত, দ্রুত কাজ শেষ করার প্রতিজ্ঞা করুন। দ্বিতীয়ত, এখানে শেখা নীতিসমূহ বারবার অনুশীলন করার জন্য নিজেকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনুন যতক্ষণ না এসব আপনার অভ্যেসে পরিণত হচ্ছে। সবশেষে, আপনি যা কিছু শিখলেন তা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে পালন করতে থাকুন যতক্ষণ না এটি আপনার আচরণ ও ব্যক্তিত্বের স্থায়ী অংশ হয়ে যায়।

নিজেকে দ্রুত অধিক উৎপাদনশীল, কার্যকর, কর্মদক্ষ ব্যক্তি হিসেবে গড়ে তোলার জন্য এক বিশেষ ব্যবস্থা নিতে পারেন। এর মধ্যে আছে কাজের প্রতি অনুরক্ত, দ্রুত কাজ সমাপনকারী, এবং কাজের প্রতি মনোনিবেশকারী ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার পুরষ্কার ও সুবিধার কথা ক্রমাগত নিজেকে স্মরণ করিয়ে দেয়া। নিজেকে এমন এক ব্যক্তি হিসেবে ভাবতে থাকুন যে কি না ক্রমাগত গুরুত্বপূর্ণ কাজ দ্রুত ও ভালভাবে শেষ করে।

নিজের সম্পর্কে আপনার মনের ধারণা নিজের আচরণের উপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। আপনি ভবিষ্যতে যে ধরনের ব্যক্তি হতে চান সেভাবেই নিজেকে দেখতে থাকুন। আপনার আত্ম-প্রতিকৃতি, মানসচক্ষে আপনি নিজেকে যেভাবে দেখেন তাই বাইরে আপনার পারফরম্যান্স নির্ধারণ করবে। বলা হয় যে, আপনি নিজেকে যা ভাবেন আসলে আপনি তাই হবেন।

নূতন দক্ষতা ও অভ্যেস রপ্ত করা এবং সামর্থ্য বাড়ানোর জন্য আপনার মধ্যে অভাবনীয় সম্ভাবনা ও সামর্থ্য রয়েছে। কালক্ষেপণ এড়ানো ও দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ করার জন্য যখন বারবার অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেকে প্রশিক্ষিত করেন তখন আপনি নিজেকে সাফল্যের সারিতে দাঁড় করানোর জন্য প্রস্তুত এবং দ্রুতই সাফল্যের পথে আপনার ত্বরণ শুরু হবে। আপনি অন্যদের পাশ কাটিয়ে দ্রুত উপরে উঠে যেতে থাকবেন।

আর দেরি কেন? খান সেই ব্যাঙ! আজই, এখনই!

Series Navigationপ্রস্তুতি নিন >>

Leave a Reply

%d bloggers like this: