সময় জ্ঞান

বাঙালির সময়জ্ঞান নিয়ে নানান ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ চলে। বলা হয়, বাঙালি হলো নটার গাড়ি কটায় ছাড়ে দেশের লোক। আরও নানা মুখরোচক গল্প আছে  সময় নিয়ে। যেমন ধরা যাক সেই কৃষক পিতার কথা। হেডমাস্টারকে বলছেন, ‘মাস্টার সাব, আমার পোলাডারে আজ একটি জলদি ছাইড়া দেন। মাঠে অনেক কাজ আছে’। শুনে হেডমাস্টার বললেন, ‘ঠিক আছে, ওকে আমি আজ এগারটায় ছেড়ে দেব’। শুনে কৃষক পিতা হায় হায় করে উঠলেন, ‘না, না, অত দেরিতে দিলে হবে না। ওরে আপনি একটায় ছুটি দেন’।

যানবাহনের সময়জ্ঞান নিয়েও আছে মজার গল্প। যেমন, ৭৪২ ডাউন ট্রেনটি প্রতিদিন স্টেশনে আসে দু’ঘণ্টা বিলম্বে। কিন্তু হঠাত্ আজ দেখা গেল ওটি এসেছে ঠিক সময়ে। ব্যাপার কী? ওহ না, ওটা এখানে আসার কথা ছিল গতকাল এই সময়ে।

আর সভা-সমিতিতে আমাদের মাননীয় প্রধান অতিথি কিংবা সভাপতির আগমন কখন ঘটবে সেটা জানেন কেবল ঈশ্বর। তবে আশার কথা হলো এটা শুধু আমাদের দেশেই নয়, অন্যদেশেও আছে। সেও যেমন তেমন দেশ নয়, একদম সভ্যতার লীলাভূমি গ্রীসে। সেই গ্রীস – যেখানে জন্মেছিলেন সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটল।

হ্যাঁ, সত্যিই তাই। গ্রীকরা সময়কে ব্যবহার করে না। সময় কাটায় মাত্র। যত পার সময় খরচ করো, হিসেব করো না সময়ের। সময় ওদের সভ্যতার প্রহরী নয়, প্রহরী নয় রান্নাঘরেরও। তাই গৃহিনীরা রান্নার সময় ঘড়ি ব্যবহার করেন না কখনই। আপনি যদি একটা ঘড়ি টাঙিয়ে দেন খাঁটি গ্রীক রমণীর রান্নাঘরে, তাহলে পাঁচ মিনিট পরই দেখতে যাবেন তা উধাও। ঘড়িতো আর মাংস সিদ্ধ করবে না। ওটা রাখব কেন?

আর হ্যাঁ, ওদের দাওয়াত দেয়ার পদ্ধতিটাও আলাদা। আপনি হয়ত বন্ধুকে বলবেন, ‘আগামীকাল দুপুরে এসো, একসাথে খাওয়া যাবে’। গ্রীকরা বলবে, ‘আগামীকাল এসো’। ব্যস, ওটুকুই! এরপর আপনি হাজির হওয়ার পর বন্ধু পত্নী রান্না বসাবেন, ওটা রান্না হবে কয়েক ঘন্টায়। তারপর খেতে লাগবে কয়েক ঘণ্টা। কেননা, খেতে বসে দেখবেন – আলুর খোসা ছাড়ানো হয়নি, মাছের আঁশ তোলা হয়নি, ফলগুলো সব আস্ত। ওসব সারতে হবে আপনাকেই। আর যদি ঠিক দুপুরবেলা গিয়ে হাজির হন বন্ধুর বাসায় তাহলে তাকে অপমান করা হবে। আপমানিত হবেন নিজেও। সবাই ভেবে নেবে আপনি কেবল খাওয়ার জন্যই গেছেন ওখানে।

কোন সভা কিংবা চার্চে হাজির হওয়ার ব্যাপারেও একই নিয়ম। যতই ঘড়ি থাকুক না কেন চার্চ কিংবা স্কুলের ঘণ্টা না বাজা পর্যন্ত কেউই পা বাড়াবেন না ঘরের বাইরে। আর যদি কাঁটায় কাঁটায় উপস্থিত হোন কোনো সভায়, সবাই মুচকি হাসবে। ঠাট্টা করে বলবে, ‘ব্যাটা ইংরেজ!’ সুতরাং নির্ধারিত সময়ের ঘণ্টাখানেক পর ওরকম সমাবেশে যাওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

‘জলদি করো’ বলে কোনো কথা পাবেন না গ্রীকদের অভিধানে। খুর জরূরী কোন কাজ হলে হয়ত কেউ বলতে পারে, কাজটা করো। সুতরাং, বুঝতেই পারছেন, বাঙালির সময়জ্ঞান নিয়ে ঠাট্টা করা মোটেই উচিত নয়।

Leave a Reply

%d bloggers like this: